পটুয়াখালীর গলাচিপা এলাকায় আগুনমুখা নদীর তীরে নৌকায় বসবাসকারী জেলেদের জীবনসংগ্রাম দেশের এক উপেক্ষিত বাস্তবতাকে সামনে আনে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুই শতাধিক পরিবার নৌকাকেই ঘর বানিয়ে টিকে আছে। প্রতিকূল প্রকৃতি ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও তারা দেশের মৎস্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে এখনো বঞ্চিত।
এই ভাসমান জনগোষ্ঠীর বড় অংশ নারী ও শিশু। নদীর উত্তাল ঢেউ আর অনিশ্চিত আবহাওয়ার মধ্যেই নারীদের জীবিকার দায় কাঁধে নিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থ বা কর্মক্ষমতা হারানো স্বামীর জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদেরই মাছ ধরতে নামতে হচ্ছে। কোলের শিশুকে নৌকার কোণে বসিয়ে জীবিকার সংগ্রামে নামা এসব নারীর বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন।
অভাবের চাপে শিশুদের জীবনও বিপন্ন হয়ে উঠছে। পড়াশোনার সুযোগ না পেয়ে অল্প বয়সেই তারা মাছ ধরার কাজে যুক্ত হচ্ছে। পরিবারে খাদ্যের নিশ্চয়তা না থাকায় শিক্ষা তাদের কাছে বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় যে লক্ষ্য, তা এই বাস্তবতায় প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সমস্যার সবচেয়ে জটিল দিকটি প্রশাসনিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতায়। বহু বছর ধরে মাছ ধরলেও এসব মানুষ এখনো সরকারিভাবে ‘জেলে’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। কারণ হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্রের অভাব দেখানো হচ্ছে। অথচ পরিচয়পত্র পেতে প্রয়োজন স্থায়ী ঠিকানা ও হোল্ডিং নম্বর—যা ভাসমান জীবনে বসবাসকারী মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। এই প্রক্রিয়াগত জটিলতা তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
ফলে ভিজিএফসহ বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে। কাগুজে নিয়মের কঠোরতা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার হচ্ছে।
এই অবস্থার পরিবর্তনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। বিশেষ বিবেচনায় তাদের জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি পুনর্বাসন, স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং শিশুদের বিদ্যালয়ে ফেরাতে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচিও চালু করা জরুরি।
রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় বাস্তবতা বিবেচনায় এনে নমনীয়তা না আনলে এই মানুষগুলো বঞ্চনার চক্র থেকে বের হতে পারবে না। এখন প্রয়োজন কাগজের নিয়ম নয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ।

