দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা গত দুই বছরে লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে, যা প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে মোট পশুর সংখ্যা কমেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৭টি। ২০২৪ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি, সেখানে চলতি বছর তা নেমে এসেছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টিতে।
এই হ্রাসকে অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—কেন এমনটা ঘটছে? মাঠপর্যায়ের খামারিদের অভিজ্ঞতা বলছে, এর পেছনে মূল কারণ উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি।
সরকারি হিসেবে অবশ্য এবার কোরবানির জন্য পশুর কোনো ঘাটতি হবে না। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, যেখানে প্রাপ্যতা রয়েছে প্রায় ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত। অর্থাৎ সরবরাহের দিক থেকে সংকট না থাকলেও উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
খামারিদের ভাষ্য অনুযায়ী, করোনা-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি পড়েছে এই খাতে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশুখাদ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এখনো সেই উচ্চমূল্যেই খাদ্য কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বৃদ্ধি। ফলে গরু-ছাগল পালন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
গ্রামের অনেক খামারি ইতোমধ্যে এই খাত থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, বেশি খরচ করে পশু পালন করেও লাভ হচ্ছে না, বরং লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে অনেকেই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে ভবিষ্যতে মাংসের দাম আরও বাড়তে পারে, একই সঙ্গে কোরবানির বাজারেও ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতি এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে ঘিরে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়, তা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত একটি বড় আর্থিক চক্র তৈরি করে। এই ব্যবস্থাকে অনেকেই একটি ‘চক্রাকার অর্থনীতি’ হিসেবে দেখেন, যেখানে শহরের অর্থ গ্রামে যায় এবং আবার গ্রাম থেকে শহরে ফিরে আসে।
তবে এই শক্তিশালী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পশুখাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ, সহজ ঋণ সুবিধা, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো—এসব উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এই খাত আরও বড় চাপে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, গবাদিপশুর সংখ্যা কমে যাওয়ার এই প্রবণতা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখন সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই হতে পারে এই খাতকে স্থিতিশীল রাখার একমাত্র উপায়।

