একসময় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত সিকদার পরিবার এখন বিপুল খেলাপি ঋণ, আইনি জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পতনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বকেয়া রেখে পরিবারের সদস্যরা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং ধারাবাহিকভাবে বিদেশেই তাদের মৃত্যুর খবর আসছে।
পরিবারটির পতনের সূচনা হয় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ ব্যক্তিত্ব বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর ধীরে ধীরে পারিবারিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও স্থিতিশীলতা ফেরেনি। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে পরিবারের প্রধান নারী সদস্যের মৃত্যু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এর অল্প সময়ের মধ্যেই সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরিবারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের আরও একজন সদস্য বর্তমানে বিদেশে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।
ব্যাংকিং খাতের একাধিক সূত্র জানায়, ঋণের চাপ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং আইনি মামলার কারণে পরিবারটির কেউ এখন দেশে অবস্থান করছেন না। যোগাযোগের মাধ্যমগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনাগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
একসময় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি বেসরকারি ব্যাংকে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে পরিবারটি। পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের একাধিক সদস্য থাকার কারণে ব্যাংকটির শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় অনিয়ম ও প্রভাব খাটিয়ে ব্যাপক ঋণ বিতরণ করা হয়, যার বড় অংশই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ধারাবাহিক লোকসানে পড়ে ব্যাংকটি টিকে থাকার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ছিল কয়েক হাজার কোটি টাকা। সময়ের সঙ্গে অনাদায়ী সুদ যুক্ত হয়ে এই অঙ্ক প্রায় ১০ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এই ঋণের বড় অংশ বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্পসহ বিভিন্ন শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া হয়েছিল।
ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেসরকারি ও সরকারি উভয় ব্যাংকই রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর থেকে ঋণ পরিশোধ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পুরো ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে।
পরিবারটির বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলায় বিদেশে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে একাধিক দেশে ব্যাংক হিসাব পরিচালনার তথ্যও উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাতের শাসনব্যবস্থা ও তদারকির দুর্বলতাকে স্পষ্ট করেছে। একই পরিবারের হাতে একটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে ঝুঁকি কতটা বাড়তে পারে, সেটির উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ঘটনা।
তারা আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথ নজরদারির অভাব মিলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা আনা এবং শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়, বরং পুরো আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ব্যাংকের তারল্য সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, একসময়কার প্রভাবশালী একটি ব্যবসায়ী পরিবারের দ্রুত পতন দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

