বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন দুই তরুণ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী—নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল আহমেদ লিমন। পরিবারের আশা ছিল, একদিন তারা ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরবেন, বদলে দেবেন নিজেদের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডিতে থেমে গেছে। এখন তারা ফিরছেন না জীবন্ত মানুষ হিসেবে, ফিরছেন স্মৃতি হয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া এই দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী ৮ মে অনুষ্ঠিত বসন্তকালীন সমাবর্তনে তাদের এই সম্মাননা দেওয়া হবে।
শুধু ডিগ্রি প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না আয়োজন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বৃষ্টি ও লিমনের স্মরণে দুটি চেয়ার খালি রাখা হবে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পালন করা হবে এক মিনিট নীরবতাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ অনেকের চোখে মানবিকতার এক গভীর প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তবে এই সম্মাননা কোনো পরিবারকেই তাদের প্রিয় সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। লিমনের পরিবার ইতোমধ্যে সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। গত সোমবার জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার লালডোবা গ্রামে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে। আরেকদিকে বৃষ্টির মরদেহ এখনও দেশে পৌঁছায়নি। মাদারীপুর সদর উপজেলার চরগোবিন্দপুরে তার পরিবার এখনো অপেক্ষা করছে শেষবারের মতো মেয়ের মুখ দেখার জন্য। জানা গেছে, আগামী শনিবার তার মরদেহ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন্দের কথায় যেন এক অসহায় পিতার দীর্ঘশ্বাস ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, ডিগ্রি আনতে যাওয়া মেয়েটি শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে ফিরছে—এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠছে। তার ভাষায়, হয়তো ডিগ্রির সনদ হাতে পাবেন, কিন্তু মেয়েকে আর কোনোদিন ফিরে পাবেন না। তবু সেই সনদই হয়তো একদিন মেয়ের স্মৃতি হয়ে দেয়ালে ঝুলবে।
বৃষ্টির চাচাও একই রকম আবেগঘন অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিবারের বহু কষ্ট আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মেয়েটি এতদূর পৌঁছেছিল। কিন্তু মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। এখন অন্তত ডিগ্রিটা পরিবারের জন্য কিছুটা সান্ত্বনা হয়ে থাকবে।
একইভাবে ভেঙে পড়েছেন লিমনের বাবা জহুরুল হকও। ছেলেকে মরণোত্তর পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার খবর শুনে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার কণ্ঠে ছিল এক অসহায় বাবার নিঃশেষ বেদনা। তিনি বলেন, ছেলে আর কোনোদিন ফিরবে না, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সম্মান তাদের কাছে স্মৃতি হয়ে থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ফ্লোরিডার মায়ামিতে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এই ঘটনা শুধু দুটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া অসংখ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি সফলতার পেছনে যেমন অগণিত ত্যাগ থাকে, তেমনি কখনো কখনো সেই স্বপ্নের মূল্যও হয়ে ওঠে অসহনীয়।
বৃষ্টি ও লিমন হয়তো আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তাদের অসমাপ্ত স্বপ্ন, সংগ্রাম আর অর্জন—সবকিছুই এখন স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে পরিবার, বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে।
সিভি/এইচএম

