বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশের জীববৈচিত্র্য, কৃষি ঐতিহ্য ও স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক সম্পদ নিয়ে। বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া এই চুক্তি কার্যকর হলে দেশের কৃষক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, গ্রামীণ কারুশিল্পী এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও জৈব সম্পদ বিদেশি করপোরেট স্বার্থের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট বা ইপিএ দেশের প্রথম কোনো উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে এমন বিস্তৃত বাণিজ্যিক চুক্তি। প্রায় ১ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য, বিনিয়োগ সুরক্ষা, শুল্ক কমানো, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকার, জিআই পণ্য এবং জেনেটিক সম্পদ সম্পর্কিত নানা বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তবে চুক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদসংক্রান্ত ধারাগুলো নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির বিতর্কিত ২৭.৩(খ) অনুচ্ছেদের আলোকে জেনেটিক সম্পদ ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের ওপর পেটেন্ট অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষক ও অধিকারকর্মীরা।
তাদের মতে, বাংলাদেশে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের শত বছরের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা ভেষজ চিকিৎসা, বীজ সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিজ জ্ঞান যথাযথ আইনগত সুরক্ষা পায়নি। ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো স্থানীয় উদ্ভিদ বা ঐতিহ্যগত জ্ঞানের নির্দিষ্ট উপাদান আলাদা করে গবেষণা ও পেটেন্টের মাধ্যমে বাণিজ্যিক মালিকানা দাবি করতে পারে।
বিশ্বজুড়ে এ ধরনের ঘটনাকে ‘বায়োপাইরেসি’ বা জীবসম্পদ দখল হিসেবে দেখা হয়। অতীতে নিম, হলুদ ও বাসমতি চাল নিয়ে আন্তর্জাতিক পেটেন্ট বিতর্ক তার বড় উদাহরণ। বাংলাদেশেও বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ ও স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক উপাদান বিদেশে পেটেন্ট হওয়ার নজির রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতি—যেমন আয়ুর্বেদ, ইউনানি, পাহাড়ি সম্প্রদায়ের চিকিৎসা জ্ঞান কিংবা গ্রামীণ লোকজ ভেষজ পদ্ধতি—এখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে নথিভুক্ত বা সুরক্ষিত নয়। ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠান গবেষণার নামে এসব জ্ঞান ব্যবহার করে নতুন পণ্য তৈরি করলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী কোনো স্বীকৃতি বা আর্থিক সুবিধা নাও পেতে পারে।
চুক্তির আওতায় উদ্ভিদ প্রজাতি সুরক্ষায় বাংলাদেশ নিজস্ব আইন রাখতে পারলেও তা “কার্যকর” হতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই “কার্যকর” শব্দটিই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। কারণ বাস্তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রায়ই বহুজাতিক বীজ কোম্পানির অনুকূলে কঠোর আইন গ্রহণে বাধ্য করা হয়।
বাংলাদেশ ২০১৯ সালে উদ্ভিদ জাত সুরক্ষা আইন করলেও সেটির বাস্তব প্রয়োগ এখনও সীমিত। বহু স্থানীয় ধান ও কৃষিজ জাত এখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে। গবেষকদের প্রশ্ন, স্থানীয় কৃষকদের সংরক্ষিত জাত পরবর্তীতে গবেষণাগারে উন্নত করে নতুন নামে নিবন্ধিত হলে মূল উদ্ভাবক কৃষকের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে?
বিশেষ করে কালিজিরা, কাটারিভোগ, চিনিগুঁড়া বা তুলশীমালার মতো সুগন্ধি চাল নিয়ে উদ্বেগ বেশি। কারণ বিদেশি প্রতিষ্ঠান এসব স্থানীয় জাত ব্যবহার করে নতুন উদ্ভাবন বা বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করলে ভবিষ্যতে বীজের মালিকানা ও কৃষকের ঐতিহ্যগত অধিকার সংকুচিত হতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ইউপিওভি ব্যবস্থায় যোগ দেওয়ার চাপ তৈরি হলে কৃষকদের বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের চিরায়ত অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউপিওভি সাধারণত উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠানের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়, যা ক্ষুদ্র কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন সমালোচকেরা।
ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৬২টি জিআই পণ্য নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে নকশিকাঁথা সম্প্রতি জামালপুরের জিআই হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি নকশিকাঁথার ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্য কীভাবে সংরক্ষিত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জিআই স্বীকৃতি যদি সীমিত অঞ্চলের মধ্যে আটকে যায়, তাহলে অন্যান্য অঞ্চলের কারুশিল্পীরা বঞ্চিত হতে পারেন। একই সঙ্গে বিদেশি বাজারে পণ্যের ব্র্যান্ডিং ও মালিকানার প্রশ্নেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। চুক্তিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ নিয়ে যৌথ উপকমিটি গঠনের কথা বলা হলেও সেখানে কৃষক, তাঁতি, কারুশিল্পী বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা স্পষ্ট নয়।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য গবেষকদের মতে, জীবসম্পদ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিচয় ও সামাজিক অস্তিত্বের অংশ। তাই জনগণের অংশগ্রহণ ও পূর্ণ স্বচ্ছতা ছাড়া এ ধরনের চুক্তি বাস্তবায়ন করলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষি ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাদের দাবি, পুরো চুক্তিটি সহজ ভাষায় জনসমক্ষে প্রকাশ করা, নাগরিক পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করা এবং স্থানীয় জ্ঞান ও জেনেটিক সম্পদ সুরক্ষায় শক্তিশালী জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

