দেশে প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও গতিশীল ও জনসেবাবান্ধব করতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে নতুন আরও পাঁচটি উপজেলা গঠন এবং উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহর বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রস্তাব উঠছে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২০তম সভায়।
সভায় এসব প্রস্তাব অনুমোদন পেলে দেশের সিটি করপোরেশনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৩টিতে। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের পরিধিও আরও বিস্তৃত হবে। আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সরকার বিভাগের একাধিক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস প্রস্তাব এতে উপস্থাপন করা হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এসব প্রস্তাবের বেশিরভাগই অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিকার সভার সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা। প্রস্তাব অনুযায়ী, এটি দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন রয়েছে—ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী বগুড়া পৌরসভার জনসংখ্যা, আয়তন, রাজস্ব আয়, বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে এই প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এখানে স্থায়ী জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার হলেও বাস্তবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে। প্রাক-নিকার কমিটি ইতোমধ্যে প্রস্তাবটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে।
নতুন পাঁচটি উপজেলা গঠনের প্রস্তাব:
সভায় বিভিন্ন জেলায় নতুন পাঁচটি উপজেলা গঠনের প্রস্তাবও উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক সেবা আরও সহজ ও বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলাকে ভাগ করে ‘মাতামুহুরী’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাবিত এলাকার সাতটি ইউনিয়ন উপকূলীয় ও দুর্গম হওয়ায় বর্ষাকালে যোগাযোগ সমস্যা এবং জলাবদ্ধতা নিয়মিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। নতুন উপজেলা হলে প্রশাসনিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলাকে বিভক্ত করে ‘মোকামতলা’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে। পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে প্রস্তাবিত এই এলাকা নীতিমালার কিছু শর্ত পূরণ না করলেও ভৌগোলিক ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় শর্ত শিথিলের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাক-নিকার কমিটি এতে সম্মতি দিয়েছে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলাকে ভেঙে ‘রুহিয়া’ ও ‘ভুল্লী’ নামে দুটি নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। বর্তমানে ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সদর উপজেলা প্রশাসনিকভাবে পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করছে। নতুন কাঠামোতে রুহিয়া উপজেলায় ছয়টি এবং ভুল্লী উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়ন থাকবে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলাকে বিভক্ত করে ‘চন্দ্রগঞ্জ’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাবও সভায় উঠছে। প্রস্তাবিত এলাকাগুলো সদর উপজেলা থেকে দূরবর্তী এবং কিছু অংশ উপকূলীয় হওয়ায় সেবা নিতে জনগণের ভোগান্তি তৈরি হয়। নতুন উপজেলা গঠিত হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি প্রস্তাব তৈরির সময় জনমত, গণশুনানি, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা আরও দ্রুত পৌঁছাবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আসবে। সব প্রস্তাব ইতোমধ্যে প্রাক-নিকার কমিটির যাচাই-বাছাই ও সুপারিশ পেয়েছে। এখন নিকার সভার চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।
নিকার সভায় এসব সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হলে দেশের প্রশাসনিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উপজেলা ও সিটি করপোরেশন সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

