চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বাস্তবতায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শুধু মুখস্থ বিদ্যা ও সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতের কর্মবাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতা করতে হলে দক্ষতা, উদ্ভাবন ও ব্যবহারিক জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও টেকসই রূপান্তর নিয়ে আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন–এর জাতীয় কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগুলো মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, অটোমেশন, বায়োটেকনোলজি, সাইবার নিরাপত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও ডাটা সায়েন্সের মতো খাতগুলো আগামী দিনের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। তাই প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী না করলে বাংলাদেশের তরুণরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, শিক্ষা এখন আর শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক বিশ্বে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হচ্ছে। ডাটা সায়েন্সের সঙ্গে জীববিজ্ঞান, আবার প্রকৌশলের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানের সংযোগ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও নতুন বাস্তবতায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিল্পখাতের চাহিদা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কারণ, একাডেমিক জ্ঞান ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জনের পরও চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনও আশানুরূপ নয়। গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনায় পিছিয়ে থাকার কারণেই এই দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। শুধু পুঁথিগত শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সরকার সহায়তা দেবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী বা এলামনাইদেরও এ কাজে যুক্ত হওয়া উচিত। বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক শিক্ষার্থীরা গবেষণা ও উদ্ভাবনে বড় ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু একাডেমিক ডিগ্রি থাকলেই কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয় না। ব্যবহারিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব অনেক শিক্ষার্থীকে চাকরির বাজারে পিছিয়ে দিচ্ছে। তাই কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব কমানো সম্ভব নয়।
তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষা কারিকুলাম আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্পখাতের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এই কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানান তিনি। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পাবে এবং শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার আগেই বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যেও সরকার নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়নের জন্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্ট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, সায়েন্স পার্ক এবং ইনোভেশন ফেয়ার আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্বে প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষানির্ভর ও মুখস্থভিত্তিক সংস্কৃতি চালু রয়েছে। ফলে সনদধারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি টেকসই হবে না বলেও মনে করছেন তারা।

