ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আশাবাদী বার্তা দিলেও এখনই কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে যেতে চাইছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, আলোচনায় থাকা মার্কিন প্রতিনিধিদের তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যেন তারা সময় নিয়ে এবং সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনাকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এই আলোচনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধবিরতি, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ।
প্রস্তাবিত সমঝোতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এই জলপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক মাসে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে, তবে উভয় পক্ষকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়োজনীয় সময় নিতে হবে। যদিও এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন যে, চুক্তির বেশিরভাগ অংশ নিয়ে সমঝোতা প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক জটিল বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
ইরানের কর্মকর্তারাও আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক মন্তব্যে বলেন, দুই দেশ ‘চুক্তির খুব কাছেও আছে, আবার অনেক দূরেও আছে।’ তার এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, কূটনৈতিক অগ্রগতি হলেও এখনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো সহজ হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন মূলত পারমাণবিক ইস্যু। বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরে সম্মত হতে পারে। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এটিকে আরও পরিশোধন করলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী হয়ে উঠতে পারে বলে পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে।
তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, তারা বিশ্বকে আশ্বস্ত করতে প্রস্তুত যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটছে না।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও এই সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী সিনেটর টেড ক্রুজ সম্ভাব্য চুক্তিকে ‘ভয়াবহ ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার মনে করেন, দীর্ঘ যুদ্ধবিরতি হলে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধাগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তবে সবাই যে সমালোচনায় মুখর, এমন নয়। প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য মাইক ললার বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে কার্যকর আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছে, যা বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। একই সময়ে কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
এরপর এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রাখে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ বহাল থাকবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও আলোচনায় ‘গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু চূড়ান্ত নয়’—এমন অগ্রগতির কথা বলেছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে হরমুজ প্রণালি আবারও পুরোপুরি সচল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ইসাক দার বলেছেন, সাম্প্রতিক আলোচনা ইতিবাচক ফলাফলের জন্য আশাবাদ তৈরি করেছে এবং সমাধান এখন নাগালের মধ্যেই রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা সফল হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাই কমবে না, বরং বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের গভীর অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

