ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে আবারও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে ইবোলা সংকট। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মংবওয়ালু শহরে একটি ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হামলার সুযোগে সেখান থেকে ১৮ জন সন্দেহভাজন ইবোলা রোগী পালিয়ে গেছেন, যাদের এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় হাসপাতাল পরিচালক ডা. রিচার্ড লোকুদি জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে একদল ক্ষুব্ধ বাসিন্দা চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা চালায়। তারা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ পরিচালিত একটি তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যেখানে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন ইবোলা আক্রান্তদের চিকিৎসা চলছিল। আগুন লাগার পর মুহূর্তেই পুরো এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ১৮ জন রোগী পালিয়ে যান।
যদিও হামলায় সরাসরি কেউ হতাহত হয়নি, তবে পরিস্থিতি এখন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ যদি সত্যিই ইবোলা আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে নতুন করে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এটি এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলার ঘটনা। এর আগেও রোয়ামপারা শহরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে এক ব্যক্তির মৃত্যু ইবোলাজনিত বলে সন্দেহ করা হলে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এরপর ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইবোলায় আক্রান্ত ব্যক্তির মরদেহ অত্যন্ত সংক্রামক হয়ে থাকে। এজন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে দাফনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়। কিন্তু স্থানীয় জনগণের অনেকেই বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারছেন না। ফলে চিকিৎসা কার্যক্রম ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা বাড়ছে।
গত শনিবার রোয়ামপারায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ইবোলা আক্রান্তদের গণদাফন সম্পন্ন হয়। রেড ক্রসের কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় কিছু যুবকের বাধা ও উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় দাফনের কাজ শেষ করতে হয়েছে। সাদা সুরক্ষা পোশাক পরা স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবাণুরোধী ব্যবস্থা অনুসরণ করে মরদেহ দাফন করেন। দূর থেকে নিহতদের স্বজনদের কান্না করতে দেখা যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উত্তর-পূর্ব কঙ্গোর বিভিন্ন এলাকায় ৫০ জনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাতভর শোকসভা ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, কঙ্গোয় বর্তমান ইবোলা পরিস্থিতি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক সংক্রমণের ঝুঁকি কম বলেই মনে করা হচ্ছে।
সংস্থাটির প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৮২টি নিশ্চিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৭৫০টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ১৭৭টি সম্ভাব্য মৃত্যুর ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে কারণ এবার যে ধরনের ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি তুলনামূলক বিরল ‘বুন্ডিবুগিও’ ধরন। এই ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো অনুমোদিত টিকা নেই। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আফ্রিকা সিডিসি বলছে, শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না, স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করাও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ জনগণের সহযোগিতা ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি সামাজিক অস্থিরতা ও জনবিশ্বাসের সংকটেও রূপ নিচ্ছে। চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা, রোগীদের পালিয়ে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি ক্ষোভ—সবকিছু মিলিয়ে ইবোলা মোকাবিলায় দেশটি এখন অত্যন্ত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

