দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
এই উদ্যোগে স্টার্টআপ খাতের জন্য আলাদা করে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থনীতি ও প্রযুক্তিখাত সংশ্লিষ্টরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তারা বলছেন, সঠিক খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই অর্থ বিনিয়োগ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে স্টার্টআপ খাত থেকেই প্রায় ৫০ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, শুধু অর্থ বরাদ্দ দিলেই হবে না। কোন খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং কীভাবে তা বিতরণ হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাবনাময় খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে এই তহবিল থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
তারা আরও মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে অর্থ বিতরণ করা হলে পুরো উদ্যোগের কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই প্রণোদনা প্যাকেজ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, স্টার্টআপ খাতের বরাদ্দ যেন শুধু আগেই বিনিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং নতুন ও উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে কাজ করা সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, ভবিষ্যৎ বাজার ও বৈশ্বিক চাহিদা বিবেচনায় কৃষি-প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা-প্রযুক্তি, আর্থিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন ও তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখতে সক্ষম।
সৈয়দ আলমাস কবীর আরও বলেন, দেশে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি প্রণোদনার একটি অংশ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য রাখার পরামর্শ দেন।
তার ভাষায়, শুধু ঋণ বা অর্থ সহায়তা দিলেই একটি স্টার্টআপ সফল হয় না। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা, পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত দিকনির্দেশনার মাধ্যমে অন্তত এক থেকে দুই বছর সহায়তা দেওয়া জরুরি। এতে নতুন উদ্যোগগুলো টিকে থাকার সক্ষমতা পাবে।
অন্যদিকে বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাসরুর মনে করেন, স্টার্টআপ তহবিলের বড় অংশ কৃষি-প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শিক্ষা-প্রযুক্তি খাতে ব্যয় করা উচিত।
তিনি বলেন, আগামী দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি। তাই এসব খাতে উদ্ভাবনী উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে এখন থেকেই বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
তার মতে, কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পের স্টার্টআপগুলো কৃষকের উৎপাদন বাড়াতে, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে এবং খাদ্যের অপচয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানিনির্ভর উদ্যোগ ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
এডুটেক খাত নিয়েও আশাবাদী ফাহিম মাসরুর। তিনি বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তুলতে শিক্ষা-প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুধু তহবিল ঘোষণা করলেই হবে না। সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে ব্যবসার সম্ভাবনা, বাজার যাচাই, আয় সক্ষমতা ও উদ্যোক্তা দলের দক্ষতার ভিত্তিতে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, যেসব স্টার্টআপ ইতোমধ্যে গ্রাহক তৈরি করেছে এবং আয় শুরু করেছে, তাদের সম্প্রসারণে সহায়তা দিলে দ্রুত ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এই ঋণ বিতরণে বেসরকারি ব্যাংক ও পেশাদার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকবে এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারা সুবিধা পাবেন।
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়ায় ই-কমার্স, আর্থিক প্রযুক্তি, সরবরাহসেবা ও পরিবহনভিত্তিক ডিজিটাল উদ্যোগ দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইনভিত্তিক সেবার চাহিদা আরও বাড়ে। তবে ২০২২ সালের পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় অনেক স্টার্টআপ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের আশা, পরিকল্পিতভাবে তহবিল ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ করা গেলে নতুন এই প্রণোদনা প্যাকেজ দেশের স্টার্টআপ খাতকে আবারও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

