দেশের চামড়া শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করতে কাজ করছে সরকার। কোরবানির পশুর চামড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এই শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
শুক্রবার রাজধানীর পোস্তায় কোরবানির কাঁচা চামড়া কেনাবেচা কার্যক্রম পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে চামড়া খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে।
মন্ত্রী জানান, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের অংশগ্রহণ এবং মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের কারণে এবার অধিকাংশ কোরবানির চামড়া ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় সংগ্রহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমিনবাজার, পোস্তা ও সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় আড়ত পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ হয়েছে এবং সেখানে দ্রুত লবণ প্রয়োগের কাজ চলছে। কোরবানির সব চামড়া একদিনে রাজধানীতে আসে না। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, বিসিক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সমন্বিত প্রচেষ্টার কারণে এবার সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। তিনি চামড়া সংরক্ষণে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, তাপমাত্রা বেশি হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই কোরবানির চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে চামড়া পরিষ্কার করে লবণ লাগানো জরুরি। এতে চামড়া কয়েক মাস পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, কাঁচা চামড়া থেকে পর্যায়ক্রমে ওয়েট ব্লু, ক্রাস্ট লেদার ও ফিনিশড লেদার তৈরি করা হয়। পরে এসব দিয়ে জুতা, স্যান্ডেল, বেল্টসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদিত হয়। সময়মতো সংরক্ষণ না করলে সেই চামড়ার শিল্পমূল্য নষ্ট হয়ে যায়।
চামড়া পাচার ঠেকাতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিবছর চামড়া পাচারের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের কোনো চামড়া অবৈধভাবে বাইরে যেতে না পারে।
সাভারের চামড়া শিল্পনগরী ও সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরের পরও কিছু ট্যানারি পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। সিইটিপির সীমাবদ্ধতা দূর করে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আরও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে সিইটিপির প্রকল্পভিত্তিক সক্ষমতা দৈনিক ২৫ হাজার কিউবিক মিটার হলেও বাস্তবে তা ১৪ থেকে ১৮ হাজার কিউবিক মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
চামড়ার মান উন্নয়নে জবাই ও স্কিনিং প্রক্রিয়াকে আধুনিক করার কথাও জানান তিনি। তার ভাষ্য, দক্ষতার সঙ্গে চামড়া আলাদা না করলে গুণগত মান নষ্ট হয়। এজন্য পুরো প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে আধুনিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ও রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। দেশের অভ্যন্তরেও এ খাতের বড় বাজার তৈরি হয়েছে।
কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ সহজ করতে সরকার ইতোমধ্যে মাদ্রাসা ও বিভিন্ন সংগ্রহকেন্দ্রে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ করেছে বলেও জানান মন্ত্রী। বিসিক ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এসব লবণ বিতরণ করা হয়েছে, যাতে চামড়া নষ্ট না হয়ে শিল্পে ব্যবহারযোগ্য থাকে।
এ সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান, বিসিকের মহাপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ টেনার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

