ঈদুল আজহার ছুটিতে রাজধানী ঢাকা অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। যানবাহনের চাপ কমে যাওয়ায় সড়কগুলোতে স্বস্তির পরিবেশ দেখা গেলেও এবার নজরে পড়ছে আরেকটি পরিবর্তন—ফাঁকা রাস্তাতেও চালকেরা ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলছেন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও শাহবাগসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরে দেখা গেছে, লাল বাতি জ্বলতেই যানবাহন থেমে যাচ্ছে। অনেক স্থানে ট্রাফিক পুলিশ উপস্থিত না থাকলেও চালকদের মধ্যে সিগন্যাল অমান্যের প্রবণতা খুব কম দেখা গেছে।
কারওয়ান বাজার মোড়ে ফার্মগেট থেকে শাহবাগমুখী সড়কে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও লাল সংকেত জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে একটি বাস থেমে যায়। ওই বাসের চালক রফিক জানান, আগে ঈদের ছুটির সময় সড়ক ফাঁকা থাকলে অনেকেই সিগন্যাল উপেক্ষা করতেন।
কিন্তু এখন বিভিন্ন মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ফলে আইন ভাঙলে মামলা হওয়ার আশঙ্কায় চালকেরা বেশি সতর্ক থাকছেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ব্যক্তিগত গাড়ির চালক শামীম। তিনি বলেন, সড়ক ফাঁকা থাকলেও এখন ট্রাফিক আইন মেনে চলার চেষ্টা করেন। কারণ ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়ম ভঙ্গ ধরা পড়লে মামলা হতে পারে। তবে তার অভিযোগ, কিছু অটোরিকশাচালক এখনো নিয়ম না মানায় মাঝেমধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
শুধু চালকেরাই নন, পরিবর্তনটি স্বস্তি দিচ্ছে পথচারীদেরও। বাংলামোটর এলাকায় কথা হয় পথচারী জাহিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, অতীতে ঈদের ছুটিতে ফাঁকা রাস্তায় অনেক গাড়ি দ্রুতগতিতে চলত, ফলে রাস্তা পারাপারে ঝুঁকি থাকত। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সামনে রাস্তা খালি থাকলেও চালকেরা সিগন্যাল মেনে চলছেন, যা পথচারীদের নিরাপত্তাবোধ বাড়িয়েছে।
ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের মতে, এবার ঈদের ছুটিতে সড়কে শৃঙ্খলা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যানবাহনের চাপ কম থাকায় তাদের কাজও কিছুটা সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে সিগন্যাল মেনে চলার প্রবণতা বাড়ায় দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমেছে বলে তারা মনে করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের সার্জেন্ট নয়ন জানান, রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে এআই ক্যামেরা স্থাপনের খবর চালকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। তার ভাষ্য, কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ত সংযোগস্থলেও চালকেরা নিজ নিজ সিগন্যাল মেনে চলছেন এবং সবুজ সংকেত পেলেই যাত্রা শুরু করছেন।
তার দাবি, এবারের ঈদের ছুটিতে প্রায় ৯০ শতাংশ চালক ট্রাফিক আইন অনুসরণ করছেন। যদিও কিছু মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের চালকের মধ্যে এখনো নিয়ম ভাঙার প্রবণতা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এআই ক্যামেরার কারণে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতাও কমেছে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে উন্নত প্রযুক্তির সিসি ক্যামেরা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে লালবাতি অমান্য করা, স্টপ লাইন অতিক্রম, উল্টো পথে চলাচল, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো এবং বাম লেন অবরোধের মতো বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করা হচ্ছে।
ক্যামেরায় ধরা পড়া তথ্য সফটওয়্যারের মাধ্যমে গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে ডিএমপির সার্ভারে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট মালিকের নামে ডিজিটাল মামলা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে গত ৩ মে ডিএমপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ারের স্বাক্ষরে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়, যানজট নিরসন, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ডিএমপি জানিয়েছে, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ হিসেবে ভিডিও ও স্থিরচিত্র সংগ্রহ করে ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে যানবাহনের মালিক বা চালকের ঠিকানায় স্বয়ংক্রিয় নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত জরিমানা পরিশোধ করে মামলা নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। তবে নোটিশ পাওয়ার পরও কেউ সাড়া না দিলে তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে রাজধানীতে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানার নামে ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে প্রতারণার চেষ্টার বিষয়েও সতর্ক করেছে ডিএমপি। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ফোনে পাঠানো অনেক বার্তাই ভুয়া এবং বিভ্রান্তিকর।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, কোনো যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হলে সংশ্লিষ্ট মালিকের ঠিকানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত অফিসিয়াল চিঠি পাঠানো হয়। প্রয়োজনে কেবল দুটি সরকারি নম্বর—০১৩২০০৪২২০৭ ও ০১৩২০০৪২২২৭—থেকে এসএমএস পাঠানো হয়ে থাকে।
একই সঙ্গে নগরবাসীকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কখনোই পিন নম্বর, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চায় না। কেউ এসব তথ্য চাইলে তা প্রতারণার চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ট্রাফিক এআই বা ভিডিও মামলা সংক্রান্ত তথ্য জানতে ডেল্টা-৩ কিংবা সরকারি নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে ডিএমপি। প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরেও যোগাযোগ করা যাবে।

