দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকদের উদ্বেগও বাড়ছে সমানতালে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে দেখা যাচ্ছে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের দীর্ঘ অপেক্ষা।
কেউ সন্তানের চিকিৎসার জন্য সর্বস্ব বিক্রি করছেন, কেউ আবার শেষ আশাটুকু নিয়েই হাসপাতালে ছুটে আসছেন। অনেক পরিবারের জন্য এই রোগ শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাম সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীসহ বেশ কয়েকটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য সামনে এসেছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, আর স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি একাধিক মানুষের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন। এ কারণে টিকাদান ব্যবস্থায় সামান্য ঘাটতিও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক গ্রামীণ এলাকায় রোগীর তথ্য নথিভুক্ত হয় না এবং অনেক পরিবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, টিকা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ প্রশংসিত ছিল। হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মহলেও ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি বলে সমালোচনা রয়েছে।
লেখকের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতের কিছু সিদ্ধান্ত ও টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হতে পারে। স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ ছিল, প্রয়োজনীয় সময়ে পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ করা হয়নি এবং বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাবও জড়িত থাকতে পারে। তাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে সংকট সৃষ্টি হলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে এবং তার রাজনৈতিক প্রভাবও পড়ে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় নানা খাতে সংকট নিয়ে বিতর্ক দেখা গেছে। সে কারণে বর্তমান হাম পরিস্থিতি নিয়েও নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে যেকোনো অবস্থাতেই শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে অনেক হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং স্নায়বিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে। গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, কারণ সেখানে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তুলনামূলক সীমিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে এক থেকে তিনজনের মৃত্যু হতে পারে। অপুষ্টি থাকলে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
এ অবস্থায় অনেক বিশেষজ্ঞ দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রয়োজন হলে জাতীয় পর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্য উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এতে দ্রুত টিকা সংগ্রহ, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা, স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি সহজ হবে।
তারা আরও মনে করেন, সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে দেশব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি চালানো গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি পদক্ষেপকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ হাম টিকাদান সপ্তাহ পালন, স্কুল ও মাদ্রাসাভিত্তিক টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ, টিকা ঘাটতির কারণ অনুসন্ধান, ভুয়া তথ্য ও টিকাবিরোধী প্রচারণা মোকাবিলা, আক্রান্ত পরিবারকে সহায়তা প্রদান এবং স্বাস্থ্য নজরদারি জোরদার করা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট মোকাবিলায় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাম শুধু একটি সংক্রামক রোগ নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ অতীতে বিভিন্ন দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এজন্য প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ, কার্যকর সমন্বয় এবং টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকার আওতা সম্প্রসারণ এবং জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

