জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে প্রবেশ করেছেন। এই পদটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়; বরং বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা, মতপার্থক্য, সমঝোতা ও বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের দিকনির্দেশনা দেওয়ার একটি বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব। এমন সময়ে তিনি এই দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা ক্রমেই বাড়ছে।
এই নির্বাচনে মোট ভোট পড়ে ১৯০টি। খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট, আর সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পান ৯১ ভোট। অর্থাৎ মাত্র ৮ ভোটের ব্যবধানে বাংলাদেশের প্রার্থী জয়ী হন। ভোটের ব্যবধান খুব বড় না হলেও এর কূটনৈতিক তাৎপর্য কম নয়। কারণ জাতিসংঘের মতো মঞ্চে এমন একটি পদে নির্বাচিত হতে হলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি বড় অংশের আস্থা অর্জন করতে হয়।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে কোন দেশ কাকে ভোট দিয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানা সম্ভব নয়। প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র একটি করে ভোট দিলেও ভোটের পছন্দ সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। তবে ব্রাজিল আগেই প্রকাশ্যে বাংলাদেশের প্রার্থীকে সমর্থনের কথা জানিয়েছিল। পাশাপাশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলোও বাংলাদেশের প্রার্থিতার পক্ষে প্রচারণা চালানোর ঘোষণা দিয়েছিল। তাই ধারণা করা যায়, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত অনেক দেশ বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই জয় ঐতিহাসিক বলার যথেষ্ট কারণ আছে। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন। এর আগে ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। সেই অভিজ্ঞতার পর আবারও বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি বিশ্বকূটনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে যাচ্ছেন। ফলে এটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের বক্তব্যেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের মতে, এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন। তবে এই সাফল্যকে শুধু মর্যাদার জায়গা থেকে দেখলে পুরো ছবিটি বোঝা যাবে না। কারণ এই পদে বসার পর খলিলুর রহমানকে এমন একটি সময়ে সাধারণ পরিষদ পরিচালনা করতে হবে, যখন বৈশ্বিক রাজনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি বিভক্ত, জটিল এবং অনিশ্চিত।

আগামী ৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে। ওই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন খলিলুর রহমান। এই সময়টিই সাধারণ পরিষদের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলোর একটি। কারণ বিশ্বের নেতারা এই মঞ্চে এসে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন, আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে কথা বলেন এবং বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নে মত দেন।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের প্রধান দায়িত্ব হবে অধিবেশন পরিচালনা করা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। তিনি পূর্ণাঙ্গ সভায় সভাপতিত্ব করবেন, আলোচনার কর্মসূচি পরিচালনা করবেন এবং বিতর্ক যেন সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাভাবে চলে তা নিশ্চিত করবেন। একই সঙ্গে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গঠনে সহায়তা করাও তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই দায়িত্বের মধ্যে আরও রয়েছে শান্তি, উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজন ও সমন্বয় করা। সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাধারণ পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করাও এই পদের অংশ।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সাধারণ পরিষদের সভাপতি জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী নন। জাতিসংঘের প্রশাসনিক প্রধান হলেন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। সাধারণ পরিষদের সভাপতি মূলত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক আলোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ এবং বহুপাক্ষিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করেন। অর্থাৎ তার হাতে সরাসরি প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও আলোচনার দিকনির্দেশনা তৈরির সুযোগ বড়।
খলিলুর রহমান তার প্রার্থিতার পক্ষে যে দৃষ্টিপত্র প্রকাশ করেছেন, সেটিই তার আসন্ন দায়িত্বের মূল ধারণা বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। এই দৃষ্টিপত্রে তিনি আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘের কথা বলেছেন। এর ভেতরে একটি স্পষ্ট বার্তা আছে—বিশ্ব এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে একা কোনো রাষ্ট্র নিরাপদ থাকতে পারে না, একা কোনো দেশ উন্নত হতে পারে না, এবং একা কোনো শক্তি বৈশ্বিক সংকটের সমাধান করতে পারে না।
দৃষ্টিপত্রের শুরুতেই তিনি বর্তমান বিশ্বের অস্থির বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাত, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা অবিশ্বাস আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে। তার মূল্যায়নে, বিশ্ব এখন এমন এক সময় পার করছে যখন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাস কমছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে।
এই জায়গাতেই তিনি সংলাপকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে সামনে এনেছেন। তার অগ্রাধিকারের একটি বড় অংশ হলো অস্ত্রের শব্দ থামিয়ে আলোচনার কণ্ঠস্বরকে জোরালো করা। এটি শুধু যুদ্ধবিরতির আহ্বান নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, আলোচনার সংস্কৃতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। বর্তমান বাস্তবতায় এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক বৈশ্বিক সংকটে শক্তির প্রদর্শন সংলাপকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছে।
উন্নয়ন প্রশ্নেও খলিলুর রহমানের দৃষ্টিপত্রে স্পষ্ট অবস্থান আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের জন্য নির্ধারিত বহু টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য এখনো পিছিয়ে আছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণসংকট, মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে বাড়তি চাপে পড়েছে। এই বাস্তবতায় তিনি বলেছেন, উন্নয়নের যাত্রায় কোনো মানুষকে পিছিয়ে রাখা যাবে না, কোনো দেশকেও বাইরে রাখা যাবে না।
এই বক্তব্যের ভেতরে উন্নয়নশীল বিশ্বের দীর্ঘদিনের দাবি প্রতিফলিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জলবায়ু সংকটের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভব করে। অথচ আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কণ্ঠ সবসময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। খলিলুর রহমানের দৃষ্টিপত্র এই জায়গায় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলছে, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তন তার দৃষ্টিপত্রের আরেকটি বড় স্তম্ভ। তিনি জলবায়ু সংকটকে শুধু পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখেননি; বরং একে উন্নয়ন, মানবিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এই অবস্থানকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলে।
তার যুক্তি হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার অনেক দেশই এই সংকট তৈরির জন্য সবচেয়ে কম দায়ী। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সক্ষমতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। এই অবস্থান নৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী, কারণ জলবায়ু আলোচনায় দায়, ক্ষতি এবং সহায়তার প্রশ্ন এখন বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
মানবাধিকার ও মানবিক সুরক্ষার প্রশ্নেও খলিলুর রহমান গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা, জলবায়ু বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোটি কোটি মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত মানুষ ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা। তার দৃষ্টিপত্রে মানুষের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখার কথা বলা হয়েছে।
যদিও তিনি সরাসরি রোহিঙ্গা সংকটের কথা উল্লেখ করেননি, তবু শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রসঙ্গ বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটের ভার বহন করছে। ফলে মানবিক সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশ্নে তার অবস্থানও সময়োপযোগী। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় এগিয়ে থাকলেও অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনো ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষতা ও নীতিগত প্রস্তুতিতে পিছিয়ে।
খলিলুর রহমান এই বৈষম্যকে নতুন ধরনের বৈশ্বিক বিভাজন হিসেবে দেখছেন। তার বক্তব্য হলো, উদ্ভাবন হতে হবে, কিন্তু তা হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। অর্থাৎ প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল শক্তিশালী রাষ্ট্র বা বড় অর্থনীতির হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার যেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও সুযোগ তৈরি করে, সেই ধরনের আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রয়োজন আছে।
জাতিসংঘ সংস্কারের প্রশ্নে তার দৃষ্টিপত্র আরও উচ্চাভিলাষী। জাতিসংঘের ৮০ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা, প্রতিনিধিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমান বিশ্ব ১৯৪৫ সালের বিশ্বের মতো নেই। শক্তির ভারসাম্য বদলেছে, অর্থনৈতিক ক্ষমতার মানচিত্র বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, সংকটের ধরন বদলেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, জাতিসংঘ কি বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে বদলাতে পারছে?
খলিলুর রহমান এমন একটি জাতিসংঘের কথা বলেছেন, যা আরও কার্যকর, আরও স্বচ্ছ এবং আরও প্রতিনিধিত্বশীল হবে। বিশেষ করে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তিনি সামনে এনেছেন। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তার হাতে সরাসরি বড় কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষমতা না থাকলেও তিনি এই আলোচনাকে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে পারেন। সাধারণ পরিষদে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলা এবং সংস্কারের প্রশ্নে চাপ ধরে রাখা তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হতে পারে।
পুরো দৃষ্টিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খলিলুর রহমান নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট বলয় বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং বিভক্ত বিশ্বের মধ্যে সংযোগ তৈরির একজন কূটনৈতিক সেতুবন্ধনকারী হিসেবে তুলে ধরেছেন। এতে বাংলাদেশের স্বার্থের ছাপ আছে, কিন্তু এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য লেখা নীতি দলিল নয়। এটি ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সামনে দেওয়া এক ধরনের বহুপাক্ষিক নেতৃত্বের রূপরেখা।
তার ভাবনার কেন্দ্রে আছে ছয়টি বড় বিষয়—শান্তি, উন্নয়ন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তি এবং জাতিসংঘ সংস্কার। এই ছয়টি স্তম্ভ আসলে বর্তমান বিশ্বের প্রধান সংকটগুলোকেই ধারণ করে। তাই তার সভাপতিত্ব সফল হবে কি না, তা শুধু অধিবেশন পরিচালনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে তিনি কতটা কার্যকরভাবে বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনার জায়গা তৈরি করতে পারেন তার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য এই জয় যেমন গর্বের, তেমনি এটি দায়িত্বেরও। কারণ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসা মানে শুধু একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করা নয়; বরং পুরো বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজে ভূমিকা রাখা। আজকের বিশ্বে যেখানে সন্দেহ, সংঘাত ও প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে খলিলুর রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—তিনি কি সত্যিই সংলাপ, সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তির ভাষাকে শক্তিশালী করতে পারবেন?
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের দায়িত্ব একটি মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জনের চেয়েও বেশি কিছু। এটি বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক আলোচনায় নতুনভাবে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ। একই সঙ্গে এটি এমন এক সময়ে বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ, যখন বিশ্ব আবারও আস্থার সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টিপত্র সেই সংকটকে স্বীকার করে এবং তার ভেতর থেকেই সমাধানের পথ খুঁজতে চায়—সংলাপের মাধ্যমে, ন্যায্যতার মাধ্যমে, এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

