বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাবিত শুল্ক পরিকল্পনা। জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের বিভিন্ন পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মঙ্গলবার (২ জুন) যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কিংবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিল্প ও শ্রমবাজারের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের বাণিজ্যিক চর্চাকে নিরুৎসাহিত করতেই নতুন এই পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের দীর্ঘ তদন্তের ভিত্তিতে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ‘ধারা ৩০১’-এর আওতায় পরিচালিত এই তদন্তে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রম, শ্রমনীতি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তদন্ত শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ, কানাডা, ইকুয়েডর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান এবং যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া তদন্তের আওতায় থাকা আরও ৪৫টি দেশের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব শুল্কনীতি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে পূর্ববর্তী শুল্কব্যবস্থার কিছু অংশ বাতিল করে দেয়। এরপর থেকেই নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয় ওয়াশিংটন।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রস্তাব বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের একটি বড় অংশের রপ্তানি এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখনো একটি প্রস্তাব মাত্র। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে আলোচনা, মতামত গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা হবে। ফলে বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে সক্রিয় উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার মানদণ্ডকেও বাণিজ্যনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য শ্রম অধিকার ও কর্মপরিবেশের বিষয়গুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত এই শুল্কনীতি চূড়ান্ত অনুমোদন পায় কি না এবং পেলে বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করে। কারণ বৈশ্বিক বাণিজ্যের বর্তমান বাস্তবতায় শুল্কের সামান্য পরিবর্তনও রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

