রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দীর্ঘমেয়াদে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সহায়তাসহ বহুমাত্রিক সহযোগিতা প্রদানের ঘোষণা এসেছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সাম্প্রতিক এই মর্মান্তিক ঘটনায় যেসব পরিবার সন্তান হারিয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে সহায়তার একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
ঘোষণা অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল ও এর অধীন পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আজীবন চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। ওষুধের খরচ ছাড়া অন্যান্য চিকিৎসাসেবা বিনামূল্যে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাবা-মা ছাড়াও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এই সুবিধার আওতায় থাকবেন বলে জানানো হয়েছে।
শুধু চিকিৎসা সহায়তাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না উদ্যোগটি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তান ও স্বজনদের শিক্ষাজীবন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল পরিচালিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলে তারা বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন। তবে উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন পেশাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিশেষ বৃত্তি, ফি মওকুফ কিংবা আর্থিক সহায়তার বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করা হবে।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর উপযুক্ত সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে হাসপাতাল বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
পাশাপাশি পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যদিও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বা কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্ষতির মাত্রা ও পারিবারিক বাস্তবতা বিবেচনায় সম্মানজনক ও উপযুক্ত সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আইনজীবী শিশির মনির অনুষ্ঠানে বলেন, একটি সন্তানের মৃত্যু কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। তবুও মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকা প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কোনো দুর্ঘটনা বা অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে সাধারণত তদন্ত, জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন সামনে আসে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ঘোষণার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। ফলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবিক সহায়তার পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। কারণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে হলে শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, নিরাপদ চিকিৎসা পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। ঘটনার পর বিভিন্ন মহল থেকে তদন্ত, জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ সহায়তার দাবি ওঠে। সর্বশেষ ঘোষণার মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার অঙ্গীকার ব্যক্ত করল।
এখন নজর থাকবে ঘোষিত সুবিধাগুলো কত দ্রুত এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয় তার দিকে। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ঘোষণার চেয়ে বাস্তব সহায়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

