কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার বিশ্বব্যাপী শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিল্পখাতও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। আর সে কারণে ভবিষ্যতে তাঁর প্রতিষ্ঠানেও কর্মীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজার এখন উৎপাদন দক্ষতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াতে রাজি নন। ফলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭৫ হাজার কর্মী কাজ করছেন। তবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রায় ১০ হাজার কর্মী কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। তাঁর মতে, এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্বব্যাপী শিল্পখাতে চলমান প্রযুক্তিগত রূপান্তরের অংশ।
এ কে আজাদ বলেন, কর্মীসংখ্যা কমানোর বিষয়টি শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জও। কারণ যেসব কর্মী দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারখানায় কাজ করছেন, তাদের অধিকাংশই দক্ষ ও অভিজ্ঞ। চাকরি হারালে তারা কোথায় যাবেন এবং কীভাবে নতুন কর্মসংস্থান পাবেন—সেই প্রশ্নের উত্তর এখন থেকেই খুঁজতে হবে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন দক্ষতা উন্নয়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
শিল্পখাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। একদিকে কাঁচামাল, জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। ফলে কিছু কিছু কারখানা ইতোমধ্যে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করতেও বাধ্য হচ্ছে।
তাঁর মতে, শুধু তৈরি পোশাক খাত নয়, দেশের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্প একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।
ঋণের উচ্চ সুদহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই শিল্প উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দ্বিগুণ চাপের মধ্যে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদহারও ব্যবসার জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প খাতকে টেকসই রাখতে ঋণের খরচ কমানো প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
তিনি আরও বলেন, দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কম সুদে অর্থায়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বড় পরিসরে নতুন চাকরি তৈরি করা কঠিন হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি আগামী এক দশকে শ্রমবাজারের চেহারা বদলে দিতে পারে। কিছু প্রচলিত চাকরি কমে গেলেও নতুন ধরনের দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ফলে প্রযুক্তিকে বাধা হিসেবে না দেখে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানবসম্পদকে খাপ খাইয়ে নেওয়া। সময়মতো দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কে আজাদের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে—যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতি একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, অন্যদিকে শ্রমবাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ফলে শিল্প, সরকার এবং শ্রমশক্তিকে সমন্বিত প্রস্তুতি নিয়েই এআই-নির্ভর ভবিষ্যতের দিকে এগোতে হবে।

