দেশের ব্যাংক খাতে বেড়ে চলা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে নতুন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে সরকার। অর্থঋণ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ঋণসংক্রান্ত জটিল মামলার নিষ্পত্তি দ্রুততর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সরকার একাধিক সংস্কারমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল বা জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে টেকসই ও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সমন্বিত রেজল্যুশন কাঠামো গড়ে তুলেছে। এ লক্ষ্যে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ কার্যকর করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, একীভূতকরণ এবং আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করা হয়েছে।
তিনি জানান, এ কাঠামোর আওতায় পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। সরকারের মতে, ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ।
আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, নতুন ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে আমানত সুরক্ষার সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা পেতেন, এখন সেই সীমা বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীদেরও এই সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করতে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বড় ঋণের ক্ষেত্রেও নতুন নীতিমালা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন ঋণগ্রহীতা সর্বোচ্চ কত পরিমাণ ঋণ নিতে পারবেন, তার সীমা নির্ধারণের কাজ চলছে। পাশাপাশি এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর না করে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি কমে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, অনেক ক্ষেত্রে ঋণখেলাপিরা উচ্চ আদালতে রিট করে ঋণ আদায়ের কার্যক্রম দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত রাখতে সক্ষম হন। এই প্রবণতা কমাতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করা।
ব্যাংক খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি বা এএমসি গঠনের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সমস্যাগ্রস্ত ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সরকার।
ভালো গ্রাহকদের উৎসাহিত করতেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা নীতিমালা আরও আধুনিক ও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি বা এডিআরের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি মাসের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের মোট খেলাপি ঋণের অন্তত ১ শতাংশ নগদ আদায় নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে।
পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণ হিসাব নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেগুলোর জন্য আলাদা মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আদালতে মামলা জট, প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের আইনি সুবিধা গ্রহণ এবং দুর্বল ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার কারণে অনেক ঋণ বছরের পর বছর অনাদায়ী অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে অর্থঋণ আদালতে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঋণসংক্রান্ত জটিল আর্থিক বিষয়গুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় আরও দক্ষতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা সম্ভব হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন আইন বা কাঠামো প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার, শক্তিশালী তদারকি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে তবেই ব্যাংক খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
সরকারের আশা, নতুন আইন, উন্নত রেজল্যুশন কাঠামো, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। বর্তমানে যে সংস্কার কার্যক্রম চলছে, তার সফল বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে দেশের ব্যাংক খাত কতটা শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

