সরকারের ঋণের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রক্ষেপণ বলছে, বর্তমান ধারায় ব্যয় ও ঋণ গ্রহণ অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের মোট সরকারি ঋণ প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি নিজে বড় সমস্যা না হলেও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য না থাকলে অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।
বাজেট-পরবর্তী অর্থনৈতিক আলোচনা যখন ঘাটতি অর্থায়ন, রাজস্ব সংগ্রহ এবং বিনিয়োগ পরিবেশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে, তখন সরকারি ঋণের ভবিষ্যৎ চিত্র নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রাক্কলনে দেখা যাচ্ছে, আগামী কয়েক বছরে ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়বে এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মার্চ শেষে সেই অঙ্ক বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ—সব মিলিয়ে ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায়। এরপর প্রতি বছরই ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যের ওপর। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি সরকারি ব্যয়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই ঋণ নিতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ গ্রহণ যদি অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাতে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু ঋণের অর্থ থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না এলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে।
সরকারি ঋণ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি খাতে। ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অধিক ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে যেতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব। এতে শিল্প ও ব্যবসা খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বৃদ্ধি এবং ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে বিদেশি ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু ঋণের অঙ্ক বড় হচ্ছে কি না, সেটি মূল বিষয় নয়। বরং দেখতে হবে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় ঋণের অনুপাত কত, ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা কতটা আয় সৃষ্টি করতে পারছে। যদি ঋণের বিপরীতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয় বাড়ে, তাহলে চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় রাজস্ব সংগ্রহ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ধীরগতি, আমদানি-রপ্তানিতে চাপ এবং ভোক্তাদের ব্যয় সক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাবও রাজস্ব আদায়ে পড়ছে। ফলে ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
নতুন বাজেটে সরকার রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতাই আগামী কয়েক বছরে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে।
আগামী তিন বছরে সরকারি ঋণ যদি সত্যিই ৩৪ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আরও সতর্ক ও দক্ষ হওয়ার প্রয়োজন হবে। কারণ ঋণের ভারসাম্য রক্ষা, প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং বেসরকারি খাতের গতিশীলতা বজায় রাখা—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

