দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের সংস্কৃতি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। এ কারণে ভবিষ্যতে দেশের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ রাখা হবে না।
রাজধানীর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্য অর্জনে পেশাদার নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করছে সরকার।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতির জন্য এ ধরনের সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ফলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক ও দক্ষ হতে হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে সরকারের একটি বড় ব্যয় চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। চলতি অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধ বাবদ প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থায়নের প্রধান উৎস হওয়া উচিত পুঁজিবাজার। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট খাত মূলত পুঁজিবাজার থেকেই দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ করে থাকে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে কার্যকর ও আস্থাশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে নীতি প্রণয়ন ও তদারকির ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। সরকারি ভর্তুকি বা কোষাগারের ওপর নির্ভর না করে তাদের নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এতে একদিকে যেমন সরকারি ব্যয়ের চাপ কমবে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও বাড়বে।
ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার লক্ষ্যে সরকারের চলমান ডিরেগুলেশন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দেশের বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা, সময়ক্ষেপণ এবং প্রশাসনিক বাধার অভিযোগ করে আসছেন। এসব সমস্যা দূর করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সমাধানের জন্য পৃথক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের সময় ও ব্যয় কমিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।
অর্থমন্ত্রী জানান, কোনো অনুমোদনের আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত এগোবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্মেলনে উপস্থিত দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সহযোগী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধের ঘোষণা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং অনিয়মের কারণে আর্থিক খাত নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়বে, করপোরেট সুশাসন শক্তিশালী হবে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তবে এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া যায় তার ওপর।

