দেশের পুঁজিবাজার ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের পরিচিত মুখ ইয়াওয়ার সাঈদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে আর্থিক খাতজুড়ে। দীর্ঘদিন ধরে সম্পদ ব্যবস্থাপনা শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ সংস্কৃতির প্রসার এবং পুঁজিবাজারের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই পেশাদার ব্যক্তিত্ব শনিবার অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পারিবারিক সূত্র ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা জানান, তিনি দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। রোগটি ধরা পড়ার সময় তা জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ইয়াওয়ার সাঈদের মৃত্যুতে দেশের পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক, করপোরেট কর্মকর্তা এবং তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই তাঁর কর্মজীবনের অবদান স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি নেতৃত্বগুণ, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং আর্থিক খাত নিয়ে গভীর আগ্রহের জন্য পরিচিত ছিলেন।
পেশাগত জীবনে তিনি দেশের অন্যতম পুরোনো এবং বেসরকারি খাতের পথিকৃৎ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইমস বাংলাদেশের নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে তিনি সম্পদ ব্যবস্থাপনা শিল্পকে একটি সুসংগঠিত ও পেশাদার খাতে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ড ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা শিল্প যখন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তখন থেকেই ইয়াওয়ার সাঈদ এ খাতকে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে কাজ করেছেন। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, পেশাদার ফান্ড ব্যবস্থাপনা এবং বাজারে সুশাসনের পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট।
দেশের পুঁজিবাজারে বিভিন্ন সময়ে অস্থিরতা ও সংকট দেখা দিলেও তিনি বরাবরই নীতিনির্ভর সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাজারের গভীরতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। বাজারকে জল্পনা-কল্পনার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালে শেয়ারবাজারের নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতি পর্যালোচনার জন্য গঠিত তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রমেও তিনি যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অধীনে গঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় বাজার সংস্কার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগে তাঁর মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়।
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়াওয়ার সাঈদ শুধু একজন করপোরেট নির্বাহী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন চিন্তাশীল পেশাজীবী, যিনি তরুণ বিনিয়োগ পেশাজীবীদের পরামর্শ দিতেন এবং দেশের আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে নিয়মিত কাজ করতেন।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর মৃত্যু শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো সম্পদ ব্যবস্থাপনা শিল্পের জন্যই একটি বড় ক্ষতি। কারণ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পেশাদারিত্ব এবং বাজার সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের কারণে তিনি এ খাতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
দেশের আর্থিক খাতে যখন সুশাসন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বাজার সংস্কার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে, ঠিক এমন সময়ে ইয়াওয়ার সাঈদের প্রয়াণ অনেকের কাছেই এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর কর্মজীবনের অবদান, পেশাদার সততা এবং পুঁজিবাজার উন্নয়নে ভূমিকা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

