দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে। জমি ইজারা, টার্মিনাল বরাদ্দ, কনটেইনার পরিবহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপারেশনাল কার্যক্রমে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগে বন্দর কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, সরকারি নীতিমালা ও প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে একাধিক ক্ষেত্রে সরাসরি বরাদ্দ, অস্থায়ী ইজারা কিংবা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় বন্দরের প্রশাসনিক কাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ী ও পর্যবেক্ষকরা।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বন্দরের মূল্যবান জমি ইজারা দেওয়ার কয়েকটি ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান ছাড়াই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমনকি আবেদন জমা দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই অনুমোদন পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ থেকে অন্যান্য আগ্রহী পক্ষ বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বন্দরের ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের ঘটনায়। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা, সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ নিয়ে আদালতেও আইনি চ্যালেঞ্জ গিয়েছে, যা বিষয়টির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে মালিকানা বিরোধে থাকা একটি জমি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে অস্থায়ী ভিত্তিতে ভাড়া দেওয়ার ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরে বিষয়টি গণমাধ্যমে আলোচিত হওয়ার পর ইজারা বাতিল করা হলেও বিতর্ক থামেনি।
খালি কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ দীর্ঘ সময় ধরে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বড় পরিসরের সেবা কার্যক্রম নিয়মিত টেন্ডারের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত ছিল। এতে ব্যয় কমার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হতো।
বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী ও শিপিং খাতের প্রতিনিধিদের মতে, দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অদক্ষতা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে বন্দরের শীর্ষ প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অভিযোগগুলোর মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ও রয়েছে। ইতোমধ্যে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি, সেবার মান হ্রাস এবং প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই শুধু অভিযোগ তদন্ত নয়, বরং ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারও জরুরি।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে এবং কোটি কোটি টন পণ্য ও লাখ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। এমন একটি কৌশলগত প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ অব্যাহত থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে হলে ভূমি ব্যবস্থাপনা, ইজারা নীতি, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং অপারেশনাল কার্যক্রমে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অনিয়মের সংস্কৃতি ভাঙা কঠিন হবে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে কার্যকর, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

