দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত দুদক সংস্কার কমিশন মোট ৪৭টি সুপারিশ করেছিল। তবে সেই সরকারের জারি করা দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে বর্তমান সরকারের তৈরি নতুন আইন সংশোধনের খসড়ায় সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সুপারিশই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
দুদকের স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যেসব সুপারিশে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল, সেগুলো খসড়ায় বিবেচনায় না নেওয়াকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন এই সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে দুদককে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত করা, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা এবং উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি তদন্তে বিশেষ ব্যবস্থা চালুর মতো ৪৭টি সুপারিশ ছিল।
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে দুদক কমিশনের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচজন করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে কমিশনে বাধ্যতামূলকভাবে একজন নারী সদস্য ও একজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাখার সুপারিশও করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন সংশোধনী খসড়ায় এসব প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হিসাব ও নিরীক্ষা কিংবা সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমে অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে খসড়ায় এ বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা রাখা হয়নি।
দুদক আইনে নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত দুই দশকে তা বাস্তবায়ন হয়নি। সংস্কার কমিশন ধাপে ধাপে নিজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে ১০ থেকে ২০ শতাংশ প্রসিকিউশন গঠন শুরু করে প্রতি বছর ১০ শতাংশ করে বৃদ্ধি করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সংশোধনী খসড়ায় এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব নেই।
দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) বিধি অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই ৯০ দিনের নোটিশ দিয়ে বা ৯০ দিনের বেতন পরিশোধ করে কর্মচারীকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে পারে। সংস্কার কমিশন এই বিধি বাতিলের সুপারিশ করলেও খসড়ায় তা রাখা হয়নি।
তবে নতুন খসড়ায় একটি সুপারিশ আংশিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এতে দুদক আইনের ৩২ক ধারা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এই ধারায় বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে দুদককে আগে সরকারের অনুমোদন নিতে হয়।
সংস্কার কমিশন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং নিবন্ধন অধিদপ্তর থেকে দুদককে তথ্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছিল। তবে খসড়ায় বলা হয়েছে, এসব সংস্থা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দুদককে তথ্য ও সহায়তা দেবে।
২০০৪ সালের দুদক আইনে কমিশন গঠনের জন্য ‘অনুসন্ধান কমিটি’ গঠনের বিধান ছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের বিধান করা হয়, যেখানে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নতুন খসড়ায় এ বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে।
আমলাতান্ত্রিক প্রভাব কমাতে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় দুদকের সচিব নিয়োগের সুপারিশ করেছিল সংস্কার কমিশন। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি নিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু খসড়ায় এসব বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
বরং নতুন সংশোধনী প্রস্তাবে দুদক সচিবের ক্ষমতা আরও বাড়ানোর একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কমিশনে শূন্যতা দেখা দিলে বিশেষ প্রয়োজনে কমিশনের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সচিব মহাপরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
এই প্রস্তাবকে আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (আইন) মঈদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “এই প্রস্তাবের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় কমিশন শূন্য রাখার সুযোগ তৈরি হবে এবং দুদক সচিবকে পুরো কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। এতে দুদকের স্বাধীন, স্বশাসিত ও নিরপেক্ষ অবস্থান হুমকির মুখে পড়বে।”
এ বিষয়ে দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খসড়ায় কর্মপরিচালনায় কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও তা সীমিত। তাঁর মতে, কমিশনহীন অবস্থায় যারা বর্তমানে দুদকের নেতৃত্বে আছেন, তাঁদের কাছ থেকে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত ও কার্যকর কমিশন কাঠামোর প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার প্রবণতা এতে স্পষ্ট।
তিনি আরও বলেন, কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সচিবের হাতে অর্পণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি গৃহীত হলে কমিশন থাকুক বা না থাকুক, আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব আরও বেড়ে যাবে এবং কমিশনের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো উপেক্ষা করাও গভীর হতাশার বিষয়।

