বাংলাদেশ সেতু, উড়ালসড়ক ও পাতাল রেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের কাছ থেকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা চাইবে। আগামী সফরে এসব প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে চীন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে সহায়তা করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির বিনিয়োগ প্রবাহ কিছুটা কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো চীন সফরে যাচ্ছেন। সফরের আগে তিনি মালয়েশিয়াও যাবেন। ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফরের পর ২৩ জুন কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। ২৬ জুন দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।
সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেতু, উড়ালসড়ক ও পাতাল রেল নির্মাণসহ একাধিক অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা চাওয়া হবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এসব প্রকল্পের একটি তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছে।
তালিকায় মোট আটটি বড় প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে আছে যমুনা নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু, পাটুরিয়া–দৌলতদিয়া করিডোরে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ঢাকা–চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা নদীর ওপর পাবনা–রাজবাড়ী সড়ক সেতু, ঢাকা ইস্ট–ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দ্বিতীয় মুক্তারপুর সেতু, ঢাকা শহরে পাতাল রেল (এস ও টি রুট) এবং মেঘনা নদীর ওপর শরীয়তপুর–চাঁদপুর সড়ক সেতু।
এসব প্রকল্প চীনা ঋণ, অনুদান এবং সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্ব কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়নের জন্য আলোচনায় তোলা হবে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পগুলো এখনো সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অর্থায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও হয়নি।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বড় অংশই আসবে বিদেশি উৎস থেকে। এক্ষেত্রে চীনের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন, সফরের জন্য প্রকল্প তালিকা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আলোচনার পরই বোঝা যাবে কোন প্রকল্পে কী ধরনের অগ্রগতি হয়।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু অন্যতম। এটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অংশ ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, বাকি অর্থ বিদেশি উৎস থেকে আসবে।
পাটুরিয়া–দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। এটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। মুক্তারপুর দ্বিতীয় সেতু প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এর বড় অংশ চীনা অনুদান থেকে আসবে বলে প্রস্তাব রয়েছে।
ঢাকা পাতাল রেল প্রকল্পে প্রায় ২৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ধাপে চারটি রুট বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দুটি রুট চীনা অর্থায়নের জন্য বিবেচনায় রয়েছে। ঢাকা পূর্ব–পশ্চিম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এটি রাজধানীর যানজট কমাতে বিকল্প করিডোর হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাবনা–রাজবাড়ী সড়কে পদ্মা নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। এটি আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করবে। ঢাকা–চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণও আলোচনায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পণ্য পরিবহন দ্রুত ও সাশ্রয়ী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। শরীয়তপুর–চাঁদপুর সেতু প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এটি উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ করবে।
সরকারের পরিকল্পনায় এসব প্রকল্প থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জানিয়েছে, এখনো কোনো প্রকল্পে চীন বা অন্য কোনো উন্নয়ন অংশীদারের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়া যায়নি। সবকিছুই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সফরে অন্তত ১৫টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, কৃষি, জ্বালানি ও বাণিজ্য খাতের বিষয় থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতা রয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ১ হাজার ১০৪ কোটি ডলার। এর বিপরীতে ২০২৪–২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ৮১৪ কোটি ডলার। কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে নতুন প্রতিশ্রুতি কিছুটা কমেছে। তবে আসন্ন সফরের পর সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

