২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন শর্ত প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে দেশের বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা। তারা বলছে, স্থানীয় শিল্প রক্ষায় এই শর্ত বহাল রাখা জরুরি।
শুক্রবার রাজধানীর গুলশান ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির মতে, শর্তটি প্রত্যাহার হলে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বাড়বে এবং বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। তাদের আশঙ্কা, এতে দেশীয় বস্ত্র শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে স্থানীয় উৎপাদন শক্তিশালী করা জরুরি বলে তারা মত দেয়।
যে চারটি দাবি জানাল বিটিএমএ:
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, সুতা আমদানি বৃদ্ধি এবং বাজেট-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে শিল্প টিকিয়ে রাখতে চারটি প্রধান দাবি তুলে ধরে বিটিএমএ।
প্রথম দাবি হিসেবে বলা হয়, ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানিতে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন শর্ত বহাল রাখতে হবে। সংগঠনটির মতে, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। তাই এই শর্ত বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় দাবি হিসেবে করপোরেট করহার ১২ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। বিটিএমএ জানায়, তৈরি পোশাক খাতে করহার ১২ শতাংশ হলেও প্রাথমিক বস্ত্র খাতে কার্যকর করহার প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ। এটিকে তারা বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করে এবং ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত সব বস্ত্র উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের করহার ১২ শতাংশ করার দাবি জানায়।
তৃতীয় দাবি হলো পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানিতে আরোপিত ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার। সংগঠনটি জানায়, বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকের চাহিদা প্রায় ৭০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশ এখনো তুলাভিত্তিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। এই কাঁচামালের ওপর শুল্ক বাড়লে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে বলে তারা সতর্ক করে।
চতুর্থ দাবি হিসেবে রপ্তানির নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে এই হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, বিটিএমএ এটিকে সাময়িকভাবে শূন্য করার দাবি জানায়।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, অর্থনীতি চাঙা করতে সরকার যে বড় অঙ্কের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো পরিষ্কার নয়। তিনি বলেন, চাহিদাহীন খাতে প্রণোদনা দিলে তা কার্যকর হবে না, বরং অপচয়ের ঝুঁকি থাকবে। তিনি আরও জানান, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়েছে, যা দেশে উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। তার ভাষায়, ২০১৯ সালের পর থেকে ২৩৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং বহু কারখানা এখন কম সক্ষমতায় চলছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা বিভিন্ন খাতে দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে আসবাব, ইলেকট্রনিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা শিল্প, প্লাস্টিক, চামড়া, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্প।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, এতে স্থানীয় কাঁচামালের পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে এবং দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

