জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামাল আমদানির অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) আয়োজিত শুনানিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠেয় এ শুনানিতে সরকারের পাশাপাশি দেশের কোনো বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিও উপস্থিত থাকছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি শুনানিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে চায় ঢাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ইউএসটিআরের শুনানিতে অংশ নেওয়ার জন্য সরকার বা বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে কোনো নিবন্ধন করা হয়নি। একইভাবে কোনো লিখিত বক্তব্যও জমা দেওয়া হয়নি। তবে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, এ বিষয়ে ইউএসটিআরের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামাল বাংলাদেশ আমদানি করে কিনা, তা যাচাই করতে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের একটি গবেষক দল বাংলাদেশ সফর করে। এর আগে একই বিষয়ে ইউএসটিআরের সঙ্গে একাধিক ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এসব আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত কোনো পণ্য বা কাঁচামাল বাংলাদেশ আমদানি করে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ অ্যাক্টের সেকশন ৩০৭-এর আওতায় উত্থাপিত অভিযোগ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিনিধিরাও বাংলাদেশের এ অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।
জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধের বিষয়টি সামনে রেখে গত জুনে বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১-এর আওতায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করে ইউএসটিআর। এ বিষয়ে আয়োজিত শুনানিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার ও বেসরকারি খাত নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ এ সুযোগ গ্রহণ করছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অনেক দেশ সরাসরি শুনানিতে অংশ না নিয়ে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন না।
তিনি জানান, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ বুঝতে পেরেছে, শুনানিতে অংশ নিলেও সিদ্ধান্তে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। কারণ ইউএসটিআর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত পারস্পরিক শুল্ক কাঠামোর বাইরে পৃথক ইস্যুতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির পর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের একটি কাঠামো বাতিল করার পর ওয়াশিংটন নতুন আইনি ভিত্তিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। পাশাপাশি বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী তদন্ত প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে সাবেক এক বাণিজ্য কর্মকর্তা মনে করেন, শুনানিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা কৌশলগতভাবে বেশি কার্যকর হতে পারত। তার মতে, ২০১৮ সালে নকল পণ্য রপ্তানির অভিযোগে বাংলাদেশ তদন্তের মুখে পড়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ শুনানিতে অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিল এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি আর এগিয়ে নেয়নি।
তিনি বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা সব সময় আলোচনাকারী দলের সুপারিশ অনুসরণ করেন না। তাই শুনানির সুযোগ কাজে লাগিয়ে তথ্য-প্রমাণসহ বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

