সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন ঘিরে সরকার ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আর্থিক চাপের কারণ দেখিয়ে আইএমএফ নতুন বেতন কাঠামো অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও সরকার সেই প্রস্তাবে সায় দিচ্ছে না। বরং আগামী অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগেই নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে এসে অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার সুপারিশ করে। সংস্থাটির মতে, বিষয়টি অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখলে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফের বার্ষিক সভায় এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। পরে নভেম্বরে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব নিয়ে আরও আলোচনা করতে চায়।
তবে সরকার এ প্রস্তাব মেনে নিতে আগ্রহী নয়। সরকারের লক্ষ্য, আইএমএফের বার্ষিক সভার আগেই গেজেট প্রকাশ করে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা। অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে নতুন পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা আগামী সপ্তাহের কোনো এক বৈঠকে বিষয়টি অনুমোদনের জন্য তোলা হতে পারে। যদিও এখনো বৈঠকের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি।
এরই অংশ হিসেবে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার এক বৈঠকে পে স্কেলের প্রস্তাব বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় সরকার নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। তবে আর্থিক চাপ কমাতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করার নির্দেশ দেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব, বাজেট ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন অর্থমন্ত্রী। এসব বৈঠকে আইএমএফের আপত্তির বিষয়গুলোও আলোচনা হয়েছে। চলতি বাজেটে এ খাতে রাখা বরাদ্দ যথেষ্ট কি না, সেটিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। একই সময়ে নতুন প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে।
আইএমএফের আশঙ্কা, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এতে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
বর্তমান অষ্টম পে স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ সময়ের মধ্যে বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জোরালো হয়ে উঠেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের আওতায় প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী আসবেন। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাও বাড়তে পারে। এর ফলে সরকারের পেনশন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় অন্তত ৮২ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি পেনশন, উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যোগ হলে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। বর্তমান অর্থবছরেও সরকারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে ব্যয় হচ্ছে। ফলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের রাজস্ব সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। এ জন্য কয়েকটি বিকল্প মডেলও বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট গ্রেডকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কয়েক ধাপে আর্থিক প্রভাব সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারের ওপর এককালীন আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হবে, অন্যদিকে আইএমএফের সঙ্গে চলমান সংস্কার কর্মসূচির ভারসাম্য বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে। অনুমোদন মিললে আইএমএফের অক্টোবরের বার্ষিক সভার আগেই নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের পথ তৈরি হবে।
দেশের চা শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে শিল্পটির বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
গতকাল সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দেশের বিভিন্ন চা বাগানের মালিক ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় চা শিল্পের উদ্যোক্তারা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থায়নের সংকট, জ্বালানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং শিল্পের টেকসই উন্নয়নের নানা বিষয় তুলে ধরেন। পাশাপাশি সরকারের কাছে বিভিন্ন নীতিগত ও আর্থিক সহায়তার প্রস্তাবও দেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ শিল্পের বিকাশে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তিনি চা বাগান মালিকদের বিদ্যমান ঋণ সহজ শর্তে পুনর্বিন্যাস এবং স্বল্প সুদে নতুন ঋণ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান। পাশাপাশি চা চাষের অনুপযোগী জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং চা শিল্পের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। কমিটি শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর সমাধানের সুপারিশ করবে।
সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং চা বাগান মালিক ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

