দেশের নগর পরিবহনে প্রযুক্তিনির্ভর ও সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় আট বছর আগে রাইড শেয়ারিং সেবার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল যাত্রী ও চালকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা এবং পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিধান এখনো বাস্তবে কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দেশের রাইড শেয়ারিং খাতে যে অনিয়ম দেখা যাচ্ছে, তার বড় কারণ হলো দুর্বল তদারকি এবং নীতিমালা বাস্তবায়নের ঘাটতি। ফলে যাত্রীদের যেমন অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে, তেমনি চালকদেরও নানা ধরনের অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
রাইড শেয়ারিং সেবা পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, নির্দিষ্ট সংখ্যক নিবন্ধিত যানবাহন, বৈধ লাইসেন্সধারী চালক, ডিজিটাল লেনদেন, অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, জরুরি সহায়তা সুবিধা, চালকদের প্রশিক্ষণ, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, প্রতিটি যাত্রার তথ্য সংরক্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের মতো নানা শর্ত রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া অনুমোদিত স্থান ছাড়া যাত্রী সংগ্রহ না করা, যাত্রার আগে সম্ভাব্য ভাড়া জানিয়ে দেওয়া এবং তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব শর্তের বড় অংশই কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারীদের অনেকেই বলছেন, অ্যাপে যে ভাড়া দেখানো হয়, বাস্তবে অনেক চালক তার চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করেন। আবার অনেকে অ্যাপ ব্যবহার না করেই সরাসরি যাত্রী তোলেন। এতে ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীর নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন মোড় ও ব্যস্ত এলাকায় মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির জটলার কারণে যানজটও বাড়ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, নারী যাত্রীদের হয়রানি, চালকদের অসদাচরণ, কার্যকর জরুরি সহায়তা না থাকা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
একজন চাকরিজীবী যাত্রী জানান, একই গন্তব্যে ভিন্ন সময়ে ভাড়া এত বেশি ওঠানামা করে যে আগে থেকে কোনো ধারণা করা যায় না। ফলে রাইড শেয়ারিং সেবা অনেকের কাছে অনিশ্চয়তার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাইড শেয়ারিং চালকদের একটি অংশের অভিযোগ, কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। সামান্য বিরোধ বা অভিযোগের কারণেও অনেক সময় চালকদের হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অনেক চালকের দাবি, এ কারণেই তারা অ্যাপ ব্যবহার না করে সরাসরি যাত্রী পরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন। এতে নীতিমালার বাইরে একটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত যাত্রী ও চালক—উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
চালকদের সংগঠনের নেতারা আরও বলেন, নীতিমালায় ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কথা থাকলেও বাস্তবে অনলাইনে শর্ত মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই সব সম্পন্ন করা হয়। অধিকাংশ চালক এসব শর্ত পুরোপুরি বুঝে সম্মতি দেন না।
বিআরটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নীতিমালার বিভিন্ন শর্ত পুরোপুরি অনুসরণ না করেই ব্যবসা পরিচালনা করছে। অনুমোদন নবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
তবে বিআরটিএর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমানে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৯ হলেও সক্রিয়ভাবে সেবা দিচ্ছে মাত্র তিন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৫ হাজার যানবাহন রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থায় নিবন্ধিত রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যানবাহন একটি বড় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের অধীনে রয়েছে।
একই সঙ্গে অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত কিছু প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাইড শেয়ারিং মূলত ব্যক্তিগত যাত্রা ভাগাভাগির ধারণা থেকে শুরু হলেও বাস্তবে এটি অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণকালীন পেশায় পরিণত হয়েছে। অথচ বিদ্যমান নীতিমালায় এ ধরনের কাঠামোর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।
তাদের মতে, চালকদের প্রশিক্ষণ, তথ্য নিরাপত্তা, পার্কিং ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নজরদারির ঘাটতির কারণে পুরো খাতটি কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা অর্জন করতে পারেনি। পাশাপাশি দেশের বাইরে তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবহন সেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া বা প্রতারণার অভিযোগ পেলে তদন্ত করা যায় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে প্রতিযোগিতা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়লে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এ বিষয়েও প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন জরুরি।
সড়ক পরিবহন বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাইড শেয়ারিং নীতিমালা হালনাগাদের কাজ চলছে। নতুন নীতিমালায় সেবাকে আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ এবং জবাবদিহিমূলক করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সরকারের অবস্থান হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানকে অযথা বন্ধ করা নয়; বরং সবাইকে আইনের আওতায় এনে নির্ধারিত নিয়ম মেনে সেবা পরিচালনা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের শহুরে পরিবহনে রাইড শেয়ারিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর সফলতা নির্ভর করছে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর। নীতিমালা থাকলেও যদি তার বাস্তব প্রয়োগ না হয়, তাহলে যাত্রী নিরাপত্তা, ভাড়া নির্ধারণের স্বচ্ছতা, তথ্য সুরক্ষা এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা—সবই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না; এর কঠোর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই এই খাতে আস্থা ফিরবে। অন্যথায় প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মূল উদ্দেশ্য পূরণ না হয়ে অনিয়মই আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

