দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে বারবার অভিযান চালাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এসব অভিযানে বিভিন্ন অপারেটরের সিম শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও জরিমানা আদায়ের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ উঠেছে, অন্য অপারেটররা যেখানে আরোপিত জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেছে, সেখানে রবি আজিয়াটার কাছে আগের বিভিন্ন সময়ের বড় অঙ্কের পাওনা এখনো অনাদায়ী রয়েছে।
একই সঙ্গে বিটিআরসির অভিযানে অবৈধ ভিওআইপি কাজে ব্যবহূত সিম শনাক্তের তালিকায় রবির নাম শীর্ষে থাকায় প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্ক তদারকি ও অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে ব্যবহূত সিম শনাক্ত হলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিটি অবৈধভাবে ব্যবহূত সিমের জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে জরিমানা আরোপের পর তা আদায়ের ক্ষেত্রে সব অপারেটরের অবস্থান এক নয়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আরোপ করা জরিমানার একটি বড় অংশ এখনো বকেয়া রয়েছে। অন্যদিকে একই ধরনের ঘটনায় অন্য কয়েকটি মোবাইল অপারেটর তাদের দায় পরিশোধ করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একটি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাওনা দীর্ঘদিন অনাদায়ী থাকার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো।
অবৈধ ভিওআইপি দীর্ঘদিন ধরে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। বৈধ আন্তর্জাতিক গেটওয়ে ব্যবহার না করে বিদেশি কল অবৈধভাবে স্থানীয় নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হয়। এতে সরকার আন্তর্জাতিক কল থেকে প্রাপ্য রাজস্ব হারায় এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত অভিযানে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে ব্যবহূত বিপুলসংখ্যক রবি ও এয়ারটেল সিম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রবির নেটওয়ার্কে ব্যবহূত সিমের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ কারণে শুধু গ্রাহকের অবৈধ ব্যবহার নয়, অপারেটরের নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ সিম বিক্রির পর গ্রাহকের কার্যক্রম নজরদারি, অস্বাভাবিক ট্রাফিক শনাক্ত এবং অবৈধ ব্যবহার বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব অপারেটরেরও রয়েছে।
অবৈধ কাজে ব্যবহূত সিম শনাক্ত হলে সাধারণত তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এসব সিমে থাকা অব্যবহূত অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কিছু অপারেটর বন্ধ হওয়া সিমে থাকা অর্থ গ্রাহককে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রাখলেও সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই ধরনের উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিমের অব্যবহূত অর্থ কোথায় যায়, তা নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন রয়েছে।
এ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় কি না, কিংবা কী প্রক্রিয়ায় এর নিষ্পত্তি করা হয়—এ বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা ও আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্পষ্ট নীতিমালার দাবি উঠছে।
অপারেটরের দায় কতটুকু?
মোবাইল অপারেটরগুলোর পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিয়ম মেনে সিম বিক্রি করা হয়। এরপর কোনো গ্রাহক সেটি অবৈধ কাজে ব্যবহার করলে দায় গ্রাহকের। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, অপারেটরের দায়িত্ব শুধু সিম বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিজস্ব নেটওয়ার্কে অস্বাভাবিক ব্যবহার শনাক্ত করা, সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও তাদের দায়িত্বের অংশ। তাদের মতে, অবৈধ ভিওআইপি বন্ধে অভিযান যেমন জরুরি, তেমনি জরিমানা দ্রুত আদায় এবং সেই তথ্য প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতার বার্তা তৈরি হতে পারে।
উঠছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: বর্তমান পরিস্থিতিতে টেলিযোগাযোগ খাতে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—
- অবৈধ ভিওআইপিতে ব্যবহূত সিমের সংখ্যা রবির নেটওয়ার্কে বেশি কেন?
- বিটিআরসির আরোপ করা আগের জরিমানার অর্থ এখনো কেন অনাদায়ী?
- অন্য অপারেটররা যেখানে পাওনা পরিশোধ করেছে, সেখানে রবির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার কারণ কী?
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বিটিআরসির উচিত বকেয়া পাওনার পরিমাণ, বকেয়ার সময়কাল এবং তা আদায়ে নেওয়া পদক্ষেপ প্রকাশ করা। বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ ভিওআইপি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। এর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব হারায় এবং বৈধ আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কমিশন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। অবৈধ কাজে ব্যবহূত সিম শনাক্ত হলে তা বন্ধ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জরিমানা আদায় একটি চলমান প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া। কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা থাকলে তা আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, অবৈধ ভিওআইপি শুধু প্রযুক্তিগত অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই জরিমানা আরোপের পাশাপাশি তা দ্রুত আদায় করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের জরিমানা দীর্ঘদিন অনাদায়ী থাকলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই নিয়ম কার্যকর না হলে বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রবি আজিয়াটার সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে লিখিত বক্তব্য দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

