বিশ্বের কোন দেশে নারীরা সবচেয়ে নিরাপদ, স্বাধীন ও সুযোগ-সুবিধাপূর্ণ জীবনযাপন করেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটি বৈশ্বিক গবেষণা পরিচালনা করেছে ‘জর্জটাউন ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’।
যেখানে শীর্ষ পাঁচটি অবস্থান দখল করে রেখেছে উত্তর ইউরোপের নর্ডিক দেশগুলো। জাতিসংঘের ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ বা ডব্লিউপিএস সূচক মেনে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদনে ১৮১টি দেশকে স্থান দিয়েছে। এই বাছাই কাজের জন্য অনুসরণ করা হয়েছে ১৩টি মানদণ্ড।
২০২৫-২৬ সালের এই সূচকে বিশ্বের ১৮১টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘের ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কাঠামো অনুসরণ করে তৈরি করা এই গবেষণায় নারীদের অবস্থান মূল্যায়নে ১৩টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ, আইনি অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ।
গবেষণায় উঠে এসেছে, নারীদের জীবনমানের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। উত্তর ইউরোপের দেশগুলো যেখানে নারীদের জন্য উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করেছে, সেখানে যুদ্ধ, সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় থাকা দেশগুলো রয়েছে তালিকার নিচের দিকে।
ডেনমার্ক শীর্ষে, সবচেয়ে পিছিয়ে আফগানিস্তান:
প্রকাশিত সূচকে ০.৯৩৯ স্কোর নিয়ে নারীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ভালো দেশ হিসেবে প্রথম অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক। এরপর রয়েছে আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। শীর্ষ দশে আরও রয়েছে লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া ও নিউজিল্যান্ড।
অন্যদিকে তালিকার সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। দেশটির স্কোর ডেনমার্কের তুলনায় অনেক কম। দীর্ঘদিনের সংঘাত, রাজনৈতিক সংকট এবং নারীদের অধিকার সীমিত হওয়ার কারণে দেশটি সবচেয়ে নিচের দিকে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৫তম:
গবেষণায় ১৮১টি দেশকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে শেষ ভাগে। ০.৫২৬ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ১৫৫তম স্থানে।
বাংলাদেশের নিচে থাকা দেশগুলোর অধিকাংশই আফ্রিকা অঞ্চলের। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পরের অবস্থানে রয়েছে ফিলিস্তিন ১৬৭তম, পাকিস্তান ১৬৯তম, মিয়ানমার ১৭২তম, সিরিয়া ১৭৮তম এবং ইয়েমেন ১৮০তম। অন্যদিকে এশিয়ার মধ্যে নারীদের জন্য তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর ১৭তম, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০তম, জাপান ২২তম, তাইওয়ান ২৭তম এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৩৭তম।
বাংলাদেশিদের পড়াশোনা, চাকরি ও ভ্রমণের জন্য পরিচিত কয়েকটি দেশের অবস্থানও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য রয়েছে ২৩তম স্থানে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ৩১তম, ইতালি ৩৯তম, থাইল্যান্ড ৫৭তম, ওমান ৫৮তম, সৌদি আরব ৬৩তম, মালয়েশিয়া ৬৭তম, শ্রীলঙ্কা ৭৭তম, মালদ্বীপ ৭৮তম, চীন ৮৯তম, নেপাল ১২০তম এবং ভারত ১৩১তম অবস্থানে রয়েছে।
কেন এগিয়ে নর্ডিক দেশগুলো?
গবেষকদের মতে, নর্ডিক দেশগুলো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে ভালো করেছে। এগুলো হলো—সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তা। এই দেশগুলোতে নারীরা মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আর্থিক স্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ বেশি পান।
এ ছাড়া শক্তিশালী সরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও কোনো দেশই পূর্ণ নম্বর অর্জন করতে পারেনি, তবুও নারীদের জীবনমানের ক্ষেত্রে নর্ডিক অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উত্তর ইউরোপের বাইরে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও ভালো অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি নারীর অধিকার ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নতির কারণে কোস্টারিকা ও উরুগুয়ে প্রথমবারের মতো শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তালিকার নিচের দিকে থাকা দেশগুলোর বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে কম স্কোর পাওয়া ১২টি দেশের ৭০ শতাংশের বেশি নারী সশস্ত্র সংঘাতপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি বসবাস করেন। ফলে এসব নারীর বাস্তুচ্যুত হওয়া, সহিংসতার শিকার হওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বেশি।
সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে নারীদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং নিরাপদ জীবনযাপন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নারীর প্রতি সহিংসতা এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় মানবাধিকার সংকট।
‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ সূচক শুধু নারীদের পরিস্থিতি নয়, একটি দেশের সামাজিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতারও চিত্র তুলে ধরে। গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব দেশে নারীরা ভালো অবস্থানে রয়েছেন, সেখানে সাধারণত অর্থনৈতিক সুযোগ বেশি, আইনি সুরক্ষা শক্তিশালী, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য এবং সহিংসতার মাত্রা কম।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান থাকা দেশগুলোতে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। গবেষকদের মতে, নারীদের জন্য নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করা শুধু নারীর উন্নয়ন নয়, বরং একটি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতারও গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

