দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ এখন তাদের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই খাবার কিনতে ব্যয় করছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে অনেক পরিবার।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবার কিনতেই ব্যয় করে। সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়ায় খাদ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে অন্যান্য মৌলিক চাহিদায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চালের দাম গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা হলেও বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে খুচরা বাজারে তা ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কৃষক বা খামার থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পথে মসুর ডালের দাম ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজ ৮৭ শতাংশ, আলু ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচ ১১৬ শতাংশ, বেগুন ৭২ শতাংশ, ডিম ২৫ শতাংশ, গরুর মাংস ১৩ শতাংশ, মাছ ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ২২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির জন্য শুধু উৎপাদন ব্যয় দায়ী নয়। বাজার কাঠামো, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং বাজারে আধিপত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণ নিতে হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা নিম্ন আয়ের মানুষই বহন করছে।
১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে সিপিডি জানিয়েছে, ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের খুচরা বিক্রেতা প্রধানত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে। তবে শুধু সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘ হলেই সব মূল্যবৃদ্ধির জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করা যায় না। প্রতিটি স্তর যদি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এসব স্তরেরও প্রয়োজনীয় ভূমিকা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে কোভিড-১৯–পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি কমে এলেও বাংলাদেশে এখনও ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এর একটি বড় কারণ দেশের উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়।
বিশ্বে যেখানে গড়ে লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির ১০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ব্যয়, বাজারজাতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মজুতদারি, বাজারের অদক্ষতা ও প্রতিযোগিতার অভাবসহ নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।

