নিজের জীবনের চেয়েও দেশের জন্য কিছু করাকেই আজীবনের ব্রত বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
তিনি বলেছেন, দেশটাকে আমি মা মনে করি। দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। এখনো কাফনের কাপড় পরার আগ পর্যন্ত এ দেশের জন্যই কাজ করে যাব। রাজনীতি করে যাব দেশের প্রয়োজনে, মানুষের কল্যাণে।
সম্প্রতি এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিজীবন, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, পরিবার ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি।
শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবদুস সালাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম, নেতৃত্ব ও রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল। স্কুলজীবনে তিনি স্কুল ক্যাপ্টেন, স্কাউট গ্রুপ লিডার এবং বিভিন্ন খেলাধুলার দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন থেকেই মানুষের জন্য কাজ করা এবং সমাজ নিয়ে ভাবার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
মা-বাবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খুব অল্প বয়সেই তিনি মাকে হারিয়েছেন। বাবার কাছেই বড় হয়েছেন। বাবা কখনো শাসনের নামে তাঁর গায়ে হাত তোলেননি। তবে বাবার একটি দৃষ্টি বা নীরব অভিব্যক্তিই তাঁকে বুঝিয়ে দিত কোন কাজটি ঠিক নয়। সেই শিক্ষাই তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রেরণা।
রাজনীতিতে না এলে কী করতেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনীতিতে আসাই ছিল তাঁর শৈশবের স্বপ্ন। পাশাপাশি একজন বড় আইনজীবী হওয়ারও ইচ্ছা ছিল। তবে মানুষের জন্য কাজ করার লক্ষ্য থেকেই তিনি রাজনীতিকে বেছে নিয়েছেন।
জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ভুলের হিসাব করেন না; বরং সামনে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেটিই ভাবেন। তবে স্বীকার করেন, পড়াশোনা শেষ করে নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। স্বাধীনতার পরও কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি এই বোধ থেকেই তাঁর সংগ্রাম এখনো অব্যাহত।
কারও কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গুরুতর কোনো অন্যায় করেছেন বলে তাঁর মনে হয় না। তবে যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সেই স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়াই তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
মুক্তিযোদ্ধা থেকে প্রশাসকের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, সারাজীবন মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়াই তাঁর লক্ষ্য ছিল। নিজের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে মানুষের কল্যাণকে তিনি সবসময় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
পরিবারকে সময় দিতে না পারার আক্ষেপের কথাও অকপটে স্বীকার করেন তিনি। বলেন, এই কষ্ট তাঁর চেয়ে বেশি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের। ছেলে যখন অভিযোগ করে “আব্বু, তুমি আমাকে সময় দাওনি” খন তাঁরও খারাপ লাগে। তবে দেশের দায়িত্ব পালনের কারণে সেই সময় আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
সন্তানদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, হয়তো তিনি তাদের জন্য বড় সম্পদ রেখে যেতে পারবেন না, কিন্তু এমন একটি পরিচয় রেখে যেতে চান, যাতে সবাই বলতে পারে “তোমরা একজন ভালো মানুষের সন্তান।” তাঁর মতে, এটাই সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
মানুষ তাঁকে ভুল বোঝে কি না এমন প্রশ্নে আবদুস সালাম বলেন, তিনি এমন কোনো কাজ করেন না যাতে মানুষ তাঁকে ভুল বোঝে। তবে কারও ব্যক্তিস্বার্থে আঘাত লাগলে যদি কেউ ভুল বোঝে, সেটি পরিবর্তন করার কিছু নেই।
জীবনের সবচেয়ে ভয়ের মুহূর্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ভয়কে জয় করেই তো বেঁচে আছি।
আবেগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাকে হারানোর কষ্ট আজও তাঁকে কাঁদায়। পাশাপাশি সমাজে অন্যায়-অবিচার দেখলেও তাঁর মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। যদি মা আজ বেঁচে থাকতেন, তবে তাঁর চেয়ে সুখী মানুষ আর কেউ হতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হিসেবে তিনি স্মরণ করেন স্বাধীনতার দিনকে। তাঁর ভাষায়, “যেদিন দেশ স্বাধীন করে ঢাকায় প্রবেশ করেছি, সেদিনই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন।”
মায়ের স্মৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খুব ছোটবেলায় মাকে হারানোর কারণে তাঁর স্মৃতি খুব বেশি নেই। তাই তিনি দেশকেই নিজের মা মনে করেন। আর সেই কারণেই দেশের জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
যাদের মা-বাবা জীবিত আছেন, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পৃথিবীতে মা-বাবার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নেই। কোনো অবস্থাতেই তাঁদের অসম্মান করা উচিত নয়। কোনো মা-বাবাই সন্তানের অকল্যাণ চান না। তাই তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব।
সাক্ষাৎকারের শেষ প্রশ্নে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে আবদুস সালাম বলেন, মানুষের ভালোবাসাই তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ। তিনি আজীবন সেই ভালোবাসা ধরে রাখতে চান। আর মৃত্যুর পর মানুষের কাছে তাঁর একটাই প্রত্যাশা “আমি যখন এই পৃথিবীতে থাকব না, তখন মানুষ যেন অন্তত একবার হলেও আমার জন্য দোয়া করে।”

