বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পানি বণ্টন, সীমান্ত পরিস্থিতি, সার্বভৌমত্ব, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের সামনে বেশ কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় ভারতের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত কিংবা কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা—কোনোটিই বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা এবং জাতীয় স্বার্থে মতবিরোধ হলে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই হতে পারে কার্যকর পথ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণধর্মী ওয়েবসাইট বিডিমিলিটারির এক সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশের জন্য এমন কৌশলের কথাই তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তাই কোনো দেশের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ানোর পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা শক্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারতকে এড়িয়ে চলার বাস্তব সুযোগ নেই। বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত, পানি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সহযোগিতার অর্থ অসম সম্পর্ক মেনে নেওয়া নয়। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
ভারতের সঙ্গে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে পাল্টা উত্তেজনা সৃষ্টি না করে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এজন্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, দক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে।
তবে এসব সম্পর্ককে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো জোট হিসেবে গড়ে তোলার ঝুঁকি রয়েছে। ভারতবিরোধী কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়লে এক ধরনের নির্ভরতা কমিয়ে অন্য ধরনের নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। তাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো শক্তির পক্ষ নেওয়া নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলা।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো
কূটনীতির পেছনে বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় সক্ষমতা থাকা জরুরি। বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে সামরিক প্রতিযোগিতায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এমন প্রতিরোধক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, যাতে বাংলাদেশের ওপর সহজে সামরিক বা কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করা না যায়।
এ ক্ষেত্রে শুধু নতুন অস্ত্র কেনার পরিবর্তে সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার, নজরদারি, ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, নৌনিরাপত্তা এবং আধুনিক যোগাযোগ ও কমান্ড ব্যবস্থার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখার মধ্যে সমন্বিত তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তবে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতারও সামঞ্জস্য থাকতে হবে। অপ্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বাংলাদেশের বাস্তব নিরাপত্তা চাহিদার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা জরুরি।
নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রয়োজন
শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র কিনে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা কঠিন। গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তির জন্য যদি কোনো দেশ পুরোপুরি বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সংকটের সময় সেই নির্ভরতা বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
তাই ধীরে ধীরে দেশে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রযুক্তি হস্তান্তর, লাইসেন্সের আওতায় উৎপাদন এবং স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা তৈরির মাধ্যমে এ সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। ড্রোন, যোগাযোগ সরঞ্জাম, সামরিক যান, নৌযান, ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা ও অন্যান্য তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত ক্ষেত্রে স্থানীয় সক্ষমতা তৈরির সুযোগ রয়েছে।
পানি নিরাপত্তাকে জাতীয় স্বার্থের অংশ করা
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি পানি। ভাটির দেশ হিসেবে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিপ্রবাহ বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তাই পানি ইস্যুকে শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন, ন্যায্য পানি ব্যবহারের নীতি এবং পরিবেশগত প্রভাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য বেশি কার্যকর। নদীর প্রবাহ, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ক্ষতি এবং সীমান্তবর্তী মানুষের ওপর প্রভাব নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা তুলে ধরতে হবে।
সীমান্তে কৌশলগত সংযম
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে তথ্য সংগ্রহ, তদন্ত ও নথিভুক্তকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর জন্য আধুনিক পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত উত্তেজনা বাড়ানো নয়; বরং যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং কার্যকর কূটনৈতিক বিকল্প থাকা।
বঙ্গোপসাগরকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার
বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বাংলাদেশকে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পাশাপাশি নতুন বন্দর ও লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, আসিয়ানভুক্ত দেশ, অস্ট্রেলিয়া, উপসাগরীয় দেশ, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব।
তবে সামরিক বা কূটনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয় শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে তাই জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কৌশল ‘ভারত না চীন’, ‘ভারত না পাকিস্তান’ কিংবা ‘যুক্তরাষ্ট্র না চীন’—এ ধরনের দ্বিমুখী পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ভরতার পরিবর্তে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।
ভারতের সঙ্গে স্বার্থের মিল হলে সহযোগিতা করতে হবে, আবার জাতীয় স্বার্থে মতবিরোধ হলে স্বাধীনভাবে অবস্থান নিতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা যেতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা উচিত নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, জাপান কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ালেও বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে, ভারতের চাপ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ হয়তো কথার লড়াই নয়, নিজের সক্ষমতা বাড়ানো। শক্তিশালী অর্থনীতি, বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা এবং পানি ও সীমান্ত ইস্যুতে তথ্য ও আন্তর্জাতিক আইনের শক্ত ভিত্তি—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ তার কৌশলগত অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে।

