দেশের প্রায় সাড়ে ছিয়াশি হাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবার আসছে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার আওতায়। চলতি অর্থবছরে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই উদ্যোগের আওতায় থাকছে বিরাশি হাজারের বেশি মসজিদ, তিন হাজারের মতো মন্দির, প্রায় সাড়ে সাতশ বৌদ্ধ বিহার এবং তিনশর বেশি গির্জা। এতে উপকৃত হবেন প্রায় আড়াই লাখ ধর্মীয় নেতা ও উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তি। চলতি মাসেই সরকারপ্রধান এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে।
সোমবার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন উপাসনালয়ে কর্মরতদের জন্য মাসিক সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে গঠিত একটি বিশেষ কমিটির সাম্প্রতিক এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এই কর্মসূচির আওতায় মসজিদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি স্তরভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক মসজিদ বাছাই করা হবে, আর পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় শ্রেণিভেদে ওয়ার্ডপ্রতি ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যক মসজিদ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একইভাবে মন্দির নির্বাচনের ক্ষেত্রেও উপজেলা ও পৌরসভার শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যা ঠিক করা হয়েছে। বৌদ্ধ বিহার ও গির্জার ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট অনুপাত মেনে নির্বাচন করা হবে।
এই পদ্ধতি থেকে বোঝা যায়, সরকার একটি সুষম ও এলাকাভিত্তিক বণ্টন পদ্ধতি অনুসরণ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের চেষ্টা করছে, যাতে দেশের সব অঞ্চলের উপাসনালয় সমানভাবে এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে।
এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত উপাসনালয়ের প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি, অর্থাৎ মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ও গির্জার যাজক প্রত্যেকে মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের সম্মানী পাবেন। এর পাশাপাশি সহকারী পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা, যেমন মুয়াজ্জিন, সেবাইত, উপাধ্যক্ষ ও সহকারী যাজকরাও তুলনামূলক কম অঙ্কের মাসিক সম্মানী পাবেন। মসজিদের খাদেমদের জন্যও আলাদা অঙ্কের সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে পাঠানো হবে, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই কার্যক্রমের জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে এগারোশ কোটি টাকার মতো বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বছর দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ধর্মীয় উপাসনালয় এই সুবিধার আওতায় আসছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে দেশের সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেই এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এই ক্রমবর্ধমান বাস্তবায়ন পদ্ধতি থেকে বোঝা যায়, সরকার একবারে সবকিছু চালুর পরিবর্তে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের কৌশল নিয়েছে, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে অপেক্ষাকৃত বাস্তবসম্মত বলে বিবেচিত হতে পারে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই বড় পরিসরের কর্মসূচি শুরুর আগে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। গত অর্থবছরে ছয় হাজারের বেশি নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রায় চৌদ্দ হাজার কর্মীকে প্রথমবারের মতো এই সম্মানী প্রদান করা হয়। সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই রাজধানীর একটি স্মৃতি মিলনায়তনে এই পাইলট কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়েছিল।
সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা শুধু ধর্মীয় নেতাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াবে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে ধর্মীয় সেবা কার্যক্রমের মান উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। তবে দেশের সব উপাসনালয়কে পর্যায়ক্রমে এই আওতায় আনার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য।

