আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব রুখতে নতুন কৌশল নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ভোটের সময় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের ওপর নজর রাখার পরিকল্পনা করছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি।
এর অংশ হিসেবে ভোটার ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ—এই পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংশোধিত আচরণ বিধিমালায় এই নতুন বিধান যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, তপশিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনে নজরদারি চালানোর বিধান রাখা হচ্ছে সংশোধিত বিধিমালায়। তবে এই নজরদারি নির্বাচন কমিশন নিজে সরাসরি করবে না—বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়ে এই কাজ করানো হবে। বর্তমানে এই সংশোধনী আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংশোধিত আচরণ বিধিমালা যাচাইয়ের জন্য ইতিমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালায় নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে প্রার্থীরা বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রচার চালাতে পারবেন। ভ্রাম্যমাণ বাহনে প্রচারণারও সুযোগ রাখা হয়েছে, তবে মাইকের ব্যবহার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে—দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে নতুন খসড়ায়।
খসড়া অনুযায়ী, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা—যেমন সরকারপ্রধান, সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়ররা—স্থানীয় নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। এ ছাড়া কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কেউ নির্বাচনের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে বা গোপনে অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না, আর প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করা যাবে না।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন বিধিমালায় ডিজিটাল প্রচারণা নিয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তাঁর প্রতিনিধি সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বা যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আগে থেকে জমা না দিয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। একইসঙ্গে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা কারও চেহারা বিকৃত করে প্রচারণা চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষমূলক প্রচারণাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে কিংবা কোনো প্রার্থীর সুনাম নষ্টের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি মিথ্যা বা মানহানিকর বিষয়বস্তু তৈরি ও প্রচার করা থেকেও বিরত থাকতে হবে প্রার্থীদের। এ ছাড়া সরকারি অতিথিশালা বা কার্যালয় নির্বাচনি প্রচারণার কাজে ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়নি খসড়ায়।
নতুন বিধিমালায় জনসভা বা শোভাযাত্রার পরিবর্তে শুধু জনসংযোগ, পথসভা ও ঘরোয়া সভার সুযোগ রাখা হয়েছে, আর এসব আয়োজনের আগে অন্তত একদিন আগে স্থানীয় পুলিশকে জানাতে হবে। পরিবেশের কথা মাথায় রেখে পলিথিন বা প্লাস্টিকজাতীয় প্রচারসামগ্রী ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যানার, ফেস্টুন ও লিফলেটের রং ও আকারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মাপ বেঁধে দেওয়া হয়েছে, আর এসব সামগ্রীতে মুদ্রণকারীর নাম-ঠিকানা উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় মিছিল বা বড় শোডাউন করার সুযোগ রাখা হয়নি, সীমিত সংখ্যক সমর্থক নিয়েই এই কাজ সারতে হবে প্রার্থীদের। নির্বাচনি প্রচারণায় হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহার, তোরণ বা গেট নির্মাণ, কিংবা বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জার ব্যবহারও নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে খসড়ায়।
এই নির্বাচন সংক্রান্ত কর্মকর্তা আরও জানান, চলতি জুলাইয়ের শেষ দিন পর্যন্ত যাঁদের বয়স আঠারো বছর পূর্ণ হয়েছে, তাঁদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক হালনাগাদে নতুন করে প্রায় তিন লাখ নয় হাজারের বেশি ভোটার যুক্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন প্রায় বারো কোটি ছিয়াশি লাখের বেশি মানুষ। ভোটার নিবন্ধনের সময়সীমা বাড়ানো হলে নতুন যোগ্য ভোটারদের সম্পূরক তালিকায় যুক্ত করার সুযোগও রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
সব মিলিয়ে, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে কমিশনের এই বহুমুখী উদ্যোগ আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে কতটা কার্যকর প্রমাণিত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

