আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট আরসিইপিতে সদস্যপদ লাভ, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমুখী করার লক্ষ্যে নিউজিল্যান্ডের রাজধানীতে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তির বরাতে জানা গেছে, বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, আর নিউজিল্যান্ডের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন দেশটির বাণিজ্য আলোচনা ও নীতি বিভাগের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
আঞ্চলিক এই বাণিজ্য জোটে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বৈঠকে বাংলাদেশ জানায়, সদস্যপদ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব ইতিমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে, এবং দেশের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে জোটের উচ্চমানের বাণিজ্য শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
যেহেতু নিউজিল্যান্ড এই জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী একটি দেশ, তাই বাংলাদেশ দেশটির কাছ থেকে সরাসরি সমর্থন প্রত্যাশা করছে। পাশাপাশি জোটের আওতায় সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাত সুরক্ষার জন্য আসিয়ানভুক্ত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মতো একই ধরনের ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি ধাপে ধাপে শুল্ক ছাড়ের সুযোগ চেয়েছে বাংলাদেশ।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে নির্ধারিত সময়সীমার পরিবর্তে আরও প্রায় তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে, এবং এই আবেদনের প্রতিও নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়েছে বৈঠকে। এই আবেদনের পেছনে যুক্তি হিসেবে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত, চলমান মূল্যস্ফীতি এবং গত বছরের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের চলমান আর্থসামাজিক রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রমের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ অনির্দিষ্টকালের জন্য পেছানোর কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই; বরং এই বাড়তি সময়কে একটি সুসংগঠিত ও টেকসই প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য মজবুত ভিত্তি তৈরি করাই মূল লক্ষ্য।
বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গও। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে নিউজিল্যান্ড তাদের দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য এলডিসি-উত্তর সময়ে নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বাভাসযোগ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
বৈঠকের শেষ ভাগে বাণিজ্যিক সহযোগিতাকে আরও গতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বাংলাদেশ তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করে। প্রথমত, আরসিইপি ও এলডিসি-উত্তর বাজার সুবিধা নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য একটি বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গোষ্ঠী গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আলোচনার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দুই দেশের সমন্বয়ে একটি যৌথ কার্যকরী দল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-সংক্রান্ত আবেদনে সমর্থন নিশ্চিত করতে নিউইয়র্কে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় আরও জোরদার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক বাংলাদেশের বহুমুখী বাণিজ্যকূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেখানে আঞ্চলিক জোটে অন্তর্ভুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক—দুটি বিষয়কেই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে তা দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও এলডিসি-উত্তর অর্থনৈতিক প্রস্তুতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

