একই দেশে জন্ম, প্রায় একই বয়স, অথচ ভবিষ্যতের পথে সবার যাত্রা এক নয়। ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা একজন তরুণ হয়তো মাসের পর মাস চাকরির আবেদন করছেন। উত্তরাঞ্চলের কোনো তরুণ ভাবছেন, এলাকায় ভালো কাজ না পেলে রাজধানীতে যাবেন, নাকি বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। উপকূলের একজন তরুণ কৃষকের চিন্তা—লবণাক্ততা বাড়লে আগামী মৌসুমে ফসল হবে তো? আবার শহরের একজন তরুণ পেশাজীবী ভাবছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সময়ে তার বর্তমান দক্ষতা কত দিন কার্যকর থাকবে।
বাসস্থান আলাদা, সমস্যার ধরন আলাদা, সুযোগের পরিমাণও এক নয়। কিন্তু প্রত্যাশা প্রায় একই। তরুণেরা এমন একটি জীবন চান, যেখানে শিক্ষা শেষে কাজের সুযোগ থাকবে, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাবে, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা থাকবে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্যও এই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে—ভিন্ন প্রেক্ষাপট, কিন্তু অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের তরুণেরা ভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যে বড় হলেও তাদের মূল চাওয়া প্রায় একই—মর্যাদা, মানসম্মত শিক্ষা, শোভন কাজ, অংশগ্রহণের সুযোগ এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি শুধু তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়—এতটুকু নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি সেই ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত?
জনমিতিক সুযোগ আছে, কিন্তু সময় সীমিত
বাংলাদেশ এখনো এমন একটি জনমিতিক পর্যায়ে আছে, যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক বেশি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ এবং এর মধ্যে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির জন্য বড় শক্তি হতে পারে। কিন্তু মানুষের সংখ্যা বেশি হলেই জনমিতিক সুবিধা পাওয়া যায় না। প্রয়োজন সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। একই বয়সী প্রায় ২০ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বেকারদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষিত। ২০২৪ সালে প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার বেকারের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার ছিলেন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষিত। উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা অন্যান্য শিক্ষাস্তরের তুলনায় বেশি।
এই পরিসংখ্যান একটি কঠিন সত্য সামনে আনে—বাংলাদেশে ডিগ্রি অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে না।
শিক্ষা বাড়ছে, কিন্তু কর্মজীবনের প্রস্তুতি কতটা?
দেশে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ সনদ নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু নিয়োগদাতার চাহিদা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শেখানো দক্ষতার মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়েছে।
২০২৫ সালের একটি জাতীয় যুব জরিপে দেখা যায়, মাত্র ১৫ শতাংশ তরুণ মনে করেন, তাদের শিক্ষা কর্মজীবনের জন্য যথেষ্টভাবে প্রস্তুত করেছে। অন্যদিকে ৩১ শতাংশের মতে, তাদের শিক্ষাজীবন চাকরির প্রস্তুতিতে প্রায় কোনো ভূমিকাই রাখেনি। আগের এক বছরে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলেন মাত্র ১২ শতাংশ উত্তরদাতা।
চাকরি পাওয়ার বাধা সম্পর্কেও তরুণদের মতামত তাৎপর্যপূর্ণ। একই জরিপে ৫৫ শতাংশ তরুণ স্বজনপ্রীতিকে, ৫০ শতাংশ পর্যাপ্ত চাকরির অভাবকে এবং ৪৯ শতাংশ সাধারণ শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্যকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ বাংলাদেশের দক্ষতার ঘাটতি কেবল কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব নয়। একজন তরুণের প্রয়োজন যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, উপাত্ত বোঝার সামর্থ্য, দলগত কাজ, পেশাগত আচরণ এবং দ্রুত নতুন কিছু শেখার মানসিকতা।
কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো পরীক্ষা, নম্বর ও সনদকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
ফলে অনেক শিক্ষার্থীর প্রকৃত কর্মজীবনের প্রস্তুতি শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পরে। অথচ এই প্রস্তুতি শিক্ষাজীবনের মধ্যেই শুরু হওয়া উচিত।
সরকারি চাকরির প্রতি এত আগ্রহ কেন?
২০২৫ সালের যুব জরিপে ৩৭ শতাংশ তরুণ সরকারি চাকরিকে তাদের পছন্দের পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী ছিলেন ২৬ শতাংশ।
সরকারি চাকরির প্রতি এই আকর্ষণকে শুধু চাকরিপ্রার্থীদের মানসিকতার সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তবতা বোঝা যাবে না।
দেশের অনেক বেসরকারি চাকরিতে বেতন কম, কর্মঘণ্টা দীর্ঘ, চাকরির নিরাপত্তা সীমিত এবং ভবিষ্যতে পদোন্নতি বা পেশাগত উন্নতির পথও অনেক সময় স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে সরকারি চাকরি এখনো তুলনামূলক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রতীক।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—দেশের বেসরকারি খাত কেন এখনো বিপুলসংখ্যক তরুণের কাছে সমানভাবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারেনি?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু চাকরিপ্রার্থীর মনোভাবের মধ্যে নেই। এটি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, ব্যবসার পরিবেশ, শ্রম অধিকার এবং কর্মসংস্থানের মানের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
চাকরি পাওয়া আর ভালো চাকরি পাওয়া এক নয়
বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট শুধু বেকারত্বের হার দিয়ে বোঝা যায় না।
২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মরত মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত। সংখ্যায় এটি প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ।
অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকা মানেই কাজ খারাপ—এমন নয়। কিন্তু এসব কাজের বড় অংশে লিখিত চুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসুবিধা, নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত উন্নতির ব্যবস্থা সীমিত।
তাই শুধু কতজন কাজ করছেন, সেই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।
দেখতে হবে কাজের মান কেমন, আয় কত, কাজের নিরাপত্তা আছে কি না, দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ আছে কি না এবং পাঁচ বা দশ বছর পরে সেই কর্মীর উন্নতির পথ কোথায়।
বাংলাদেশের তরুণদের প্রয়োজন শুধু কাজ নয়, প্রয়োজন মর্যাদাপূর্ণ ও স্থিতিশীল কাজ।
তরুণ নারীদের পথ আরও কঠিন
বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির সমান প্রতিফলন শ্রমবাজারে দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে দেশের মোট শ্রমশক্তি প্রায় ১৭ লাখ কমেছে। এর বড় অংশই নারী। নারী শ্রমশক্তির সংখ্যা ২০২৩ সালের প্রায় ২ কোটি ৫৩ লাখ থেকে ২০২৪ সালে প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখে নেমে আসে।
উচ্চশিক্ষিত নারীদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে নারী স্নাতকদের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ২০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে পুরুষ স্নাতকদের ক্ষেত্রে হার ছিল প্রায় ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
এই বৈষম্যের পেছনে শুধু চাকরির অভাব নেই। নিরাপদ যাতায়াত, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, শিশুযত্ন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, বাসস্থানের সমস্যা এবং সামাজিক প্রত্যাশা—সবকিছু মিলিয়ে একজন নারীর কর্মজীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।
তাই নারীদের শিক্ষায় অগ্রগতি এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখা—দুটি আলাদা নীতিগত বিষয়।
ডিজিটাল অগ্রগতির আড়ালে নতুন বৈষম্য
বাংলাদেশে মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তার নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু একটি স্মার্টফোন হাতে থাকা আর প্রযুক্তিগত সুযোগের সমান অধিকার পাওয়া এক বিষয় নয়।
এখন শুধু ইন্টারনেট আছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—কার কাছে ভালো মানের যন্ত্র আছে, কে স্থিতিশীল উচ্চগতির সংযোগ ব্যবহার করতে পারে, কার কম্পিউটার আছে, কে মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারে এবং কে প্রযুক্তিকে শুধু বিনোদনের বদলে শিক্ষা ও আয়ের কাজে লাগাতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪–২৫ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ছিল প্রায় ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ। শহরে এই হার ছিল ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ, আর গ্রামে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যবধান আরও বড়। শহরের প্রায় ২১ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের কম্পিউটার রয়েছে, কিন্তু গ্রামীণ পরিবারে এই হার মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এই বৈষম্য ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ঢাকার একজন শিক্ষার্থী যদি দ্রুতগতির ইন্টারনেট, কম্পিউটার, অনলাইন শিক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নানা সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রতিদিন নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারেন, আর গ্রামের একজন শিক্ষার্থী যদি সীমিত ইন্টারনেট ও নিম্নমানের মুঠোফোনে আটকে থাকেন, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে তাদের দক্ষতার ব্যবধান আরও বাড়বে।
ভবিষ্যতের বৈষম্য তাই শুধু ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে থাকবে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম মানুষ এবং প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের মধ্যেও নতুন ব্যবধান তৈরি হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী বদলে দেবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, আবার নতুন ঝুঁকিও আনছে।
২০২৬ সালের মে মাসে অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সতর্ক করেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যন্ত্রনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৫৬ লাখ চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর প্রায় ৫০ লাখ নতুন কাজ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এটি কোনো নিশ্চিত সরকারি পূর্বাভাস নয়, বরং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে একটি সতর্কতামূলক হিসাব।
মূল প্রশ্ন হলো, নতুন ধরনের কাজ তৈরি হলে বাংলাদেশের তরুণেরা সেই কাজের জন্য প্রস্তুত থাকবে কি না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা মানে সবাইকে গণনাযন্ত্রের কর্মসূচি তৈরির বিশেষজ্ঞ বানানো নয়। প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মৌলিক জ্ঞান, তথ্য যাচাই, উপাত্ত বোঝা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, ভাষাজ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগানোর ক্ষমতা।
যে তরুণ দ্রুত নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন, তিনি এগিয়ে থাকবেন। আর যারা এই পরিবর্তনের বাইরে থাকবেন, তাদের জন্য শ্রমবাজার আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু সংকটও তরুণদের ভবিষ্যতের সংকট
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, অভিবাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
বিশেষ করে উপকূল, চর এবং হাওর অঞ্চলের তরুণদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। এটি বর্তমান বাস্তবতা।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি গবেষণায় ৪০৩টি উপকূলীয় পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পূর্ণাঙ্গ পরিবার স্থানান্তরের প্রায় ২৭ দশমিক ৪১ শতাংশ নদীভাঙনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
একই সময়ের আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে উপকূলীয় লবণাক্ততা ২৬ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং জলবায়ুর প্রভাবে কৃষকের বার্ষিক উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলোর পেছনে রয়েছে বাস্তব জীবনের কঠিন পরিবর্তন।
একটি পরিবার জমি হারালে শুধু সম্পদ হারায় না। একজন তরুণের জীবিকার ধারাও বদলে যেতে পারে। কৃষিতে ভবিষ্যৎ না দেখলে তাকে শহরে আসতে হয়। শহরে দক্ষতা অনুযায়ী কাজ না পেলে অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত হতে হয়। অনেকের কাছে বিদেশে যাওয়া শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে ওঠে।
তাই জলবায়ু অভিযোজনকে শুধু বাঁধ, সড়ক বা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এটিকে তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ, পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ুসহনশীল কৃষি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ তথ্যসেবার মতো খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
কেন এত তরুণ বিদেশে যেতে চান?
বিদেশে পড়াশোনা বা কাজ করা কোনো সমস্যা নয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ব্যক্তি ও দেশের উভয়ের জন্য উপকারী হতে পারে।
কিন্তু যখন বিপুলসংখ্যক তরুণ নিজের দেশে ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেয়ে বিদেশে যাওয়াকে বেশি নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত মনে করেন, তখন বিষয়টি শুধু অভিবাসনের প্রবণতা নয়। এটি দেশের সুযোগ, প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তরুণদের আস্থারও একটি সূচক।
একটি জাতীয় যুব জরিপে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৩ হাজার ৮১ জন তরুণের মধ্যে ৫৫ শতাংশ বিদেশে পড়াশোনা বা কাজের জন্য যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
একই জরিপে ৪২ শতাংশ বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ৩৭ শতাংশ দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে বেকারত্বের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ২০ শতাংশ নিয়োগে বৈষম্যকে সমস্যা হিসেবে দেখেন।
২০২৫ সালের আরেক যুব জরিপে যারা আগে বিদেশে কাজ করেননি, তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশে কর্মসংস্থানে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন।
তরুণদের বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে বিদেশে যাওয়া হবে একটি পছন্দ, বাধ্যতামূলক পালানোর পথ নয়।
তাহলে কী বদলাতে হবে?
বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ বদলাতে কয়েকটি জায়গায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রথমত, কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। মোট দেশজ উৎপাদন কত বাড়ল, সেটির পাশাপাশি বছরে কতটি মানসম্মত নতুন চাকরি তৈরি হলো, সেটিকেও উন্নয়নের বড় সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, পেশা নির্দেশনা এবং বাস্তব সমস্যাভিত্তিক কাজের সুযোগ বাড়ানো দরকার।
তৃতীয়ত, সুযোগের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ভালো চাকরি, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তা সহায়তা শুধু রাজধানী বা কয়েকটি বড় শহরে সীমাবদ্ধ থাকলে জন্মস্থানই একজন তরুণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে শুরু করবে।
চতুর্থত, তরুণ নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত, শিশুযত্ন, নমনীয় কর্মব্যবস্থা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে।
পঞ্চমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে মৌলিক দক্ষতা হিসেবে দেখতে হবে। বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই কম্পিউটার ব্যবহার, তথ্য যাচাই, উপাত্ত বোঝা, ভাষাজ্ঞান এবং তথ্যনিরাপত্তা শেখানোর সুযোগ বাড়াতে হবে।
ষষ্ঠত, জলবায়ু অভিযোজনকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তরুণদের জন্য জলবায়ুসহনশীল কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।
সবশেষে, নিয়োগ ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। স্বচ্ছ নিয়োগ, যোগ্যতার মূল্যায়ন, নির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং নীতি প্রণয়নে তরুণদের বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
তরুণদের ভবিষ্যৎ আসলে কোথায়?
বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ কোনো একটি শহরে, একটি চাকরিতে বা একটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়।
ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বাংলাদেশ তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে কীভাবে দেখছে তার ওপর।
তাদের কি শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে দেখা হবে, নাকি উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, কৃষক, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, শিল্পী, দক্ষ কর্মী এবং ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠান নির্মাতা হিসেবেও মূল্য দেওয়া হবে?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা তরুণদের স্বপ্নের অভাব নয়। সমস্যা হলো, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ অনেকের জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত।
ঢাকার একজন স্নাতক, সাতক্ষীরার কৃষক পরিবারের তরুণ, সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থী কিংবা কুড়িগ্রামের চাকরিপ্রার্থী—তাদের বাস্তবতা এক নয়। তাই সবার জন্য একই ধরনের নীতি যথেষ্ট হবে না।
তবে একটি জায়গায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবার জন্য সমান হওয়া উচিত—জন্মস্থান, লিঙ্গ, পরিবারের আর্থিক অবস্থা কিংবা প্রযুক্তিগত সুযোগের অভাবে যেন কোনো তরুণের সম্ভাবনার সীমা আগেই নির্ধারিত হয়ে না যায়।
বাংলাদেশের হাতে এখনো তরুণ জনগোষ্ঠীর বিশাল শক্তি আছে। কিন্তু এই সুযোগের সময়সীমা অনন্ত নয়।
তরুণদের যদি দক্ষতা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা, মানসম্মত শিক্ষা এবং উৎপাদনশীল কাজের পথ তৈরি করে দেওয়া যায়, তারাই দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।
আর যদি লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘ সময় কাজের বাইরে থাকেন, নারীরা শ্রমবাজার থেকে সরে যান, গ্রামের তরুণ প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়েন এবং দক্ষ মানুষের বড় অংশ দেশের বাইরে ভবিষ্যৎ খুঁজতে বাধ্য হন, তাহলে আজকের জনমিতিক সুবিধাই একদিন জনমিতিক চাপে পরিণত হতে পারে।
তাই বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর আসলে শুধু তরুণদের কাছে নেই।
উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমরা আজ কী ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা, শ্রমবাজার, অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছি তার মধ্যে।

