মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বাড়ছে এর অপব্যবহারও। সন্দেহজনক লেনদেন, অনলাইন জুয়া, প্রতারণামূলক ওটিপি এবং ভুয়া পরিচয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো অপরাধ ঠেকাতে সিম নিবন্ধন ও এমএফএস ব্যবস্থায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনছে সরকার।
নতুন ব্যবস্থায় সিম নিবন্ধনের সময় মোবাইল অপারেটরদের কাছে গ্রাহকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা মুখের বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে না। কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করেই সিম নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
একটি এনআইডির বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি সিম রাখা যাবে। নতুন একটি সিম নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের সিম নিবন্ধনের পর অন্তত সাত দিন অপেক্ষা করতে হবে। একই এনআইডিতে দুইটির বেশি সিম নিবন্ধন হলে কেন্দ্রীয় বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম ও পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে অতিরিক্ত যাচাই করা হবে।
মৃত ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিমও নজরদারির আওতায় আসছে। সরকারি ডাটাবেজে মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হওয়ার ছয় মাস পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে থাকা সিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডি-রেজিস্টার করার ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য মৃত্যুর তথ্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভুয়া ও অবৈধ সিম শনাক্তে একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী, গোয়েন্দা ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রি-অ্যাকটিভেটেড সিম, ভুয়া করপোরেট সিম ও আইএমইআই ক্লোনিং ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।
করপোরেট সিম ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, ট্রেড লাইসেন্স, সিমের সংখ্যা এবং প্রকৃত ব্যবহারকারী যাচাই করে সিম অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি করপোরেট সিমের বিপরীতে প্রকৃত ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ও এনআইডি নম্বর সংরক্ষণ করা হবে।
এমএফএস অ্যাকাউন্টেও বাধ্যতামূলক পরিচয় যাচাই
সিমের পাশাপাশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রেও পরিচয় যাচাই কঠোর করা হচ্ছে। এনআইডি ও বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে এমএফএস অ্যাকাউন্ট খোলা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চালু থাকা অ্যাকাউন্টগুলোও যাচাই করে ভুয়া ও অবৈধ ব্যবহারকারী শনাক্ত করা হবে।
সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে রিয়েল-টাইম নজরদারি চালুর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেন, প্রতারণার ধরন, অর্থ পাচারের প্রবণতা এবং একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থ সরানোর মতো কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী, গোয়েন্দা ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
লেনদেনের স্থানও নজরদারিতে
সন্দেহজনক লেনদেন শুধু কার মাধ্যমে হয়েছে তা নয়, কোথা থেকে হয়েছে—সেই তথ্যও যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে চায় সরকার। এজন্য এমএফএস অ্যাপগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এজেন্টরা যাতে নির্ধারিত এলাকার বাইরে ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারেন, সে জন্য জিও-ফেন্সিং ব্যবস্থাও চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজেন্ট পর্যায়ের লেনদেনে গ্রাহকের এনআইডি ও ছবিসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিটাল লেজারে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে।
সব এমএফএস লেনদেনে এসএমএসের মাধ্যমে ওটিপি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহক ও এজেন্টদের ই-কেওয়াইসি নিয়মিত হালনাগাদ ও যাচাই করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিম নিবন্ধনের নিয়ম কঠোর করলেই ডিজিটাল প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। একজন ব্যক্তির এনআইডি, সিম, এমএফএস অ্যাকাউন্ট এবং লেনদেনের ধরন—এসব তথ্যের মধ্যে অসংগতি শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
ফিনটেক ও ডিজিটাল ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার মো. ফিরোজ কবীরের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ‘ওয়ান পারসন, ওয়ান ভেরিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে একজন ব্যক্তির সিম, এমএফএস ও ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট প্রকৃত পরিচয়ের সঙ্গে নির্ভরযোগ্যভাবে যুক্ত থাকবে।
তবে এই ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সব প্রতিষ্ঠানের কাছে নাগরিকের সম্পূর্ণ তথ্য উন্মুক্ত না করে প্রয়োজনভিত্তিক ও নিরাপদ তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
সব মিলিয়ে সরকারের নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু সিমের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং পরিচয় যাচাই, নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আগাম প্রতারণা শনাক্তকরণের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভুয়া পরিচয়ে সিম ও এমএফএস ব্যবহারের সুযোগ কমার পাশাপাশি প্রতারণা, অর্থ পাচার ও অন্যান্য আর্থিক অপরাধ শনাক্ত করাও সহজ হতে পারে।

