স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রথমবারের মতো সামরিক অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরবেলা সংঘটিত সেই অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রাণ হারান। এই ঘটনার পটভূমি তৈরি হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন দেশজুড়ে চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল।
বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো পাল্টে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সে সময় একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছিল, যার আওতায় হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বাকি সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে দুর্নীতি, লুটপাট ও চুরি-ডাকাতির ঘটনা নিয়ে জনমনে গভীর অসন্তোষ ও আতঙ্ক দানা বাঁধছিল। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা ও নেতাকর্মীদের বিচারবহির্ভূত গ্রেপ্তার-হত্যার প্রতিবাদে কয়েকটি চরমপন্থী সংগঠন সরকারবিরোধী তৎপরতা জোরদার করেছিল। আগস্টের কয়েক মাস আগেই শেখ মুজিবের ওপর একবার হামলার চেষ্টা হয়েছিল বলে সে সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনকে অবহিত করেছিল।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, তখনকার পরিস্থিতি ছিল রীতিমতো নিঃশ্বাসরুদ্ধকর। নিয়মতান্ত্রিক পথে সমস্যার সমাধান না দেখতে পেয়েই সম্ভবত সেনাবাহিনীর একাংশ ক্ষমতা দখলের পথ বেছে নিয়েছিল।
অর্থনৈতিক অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র: স্বাধীনতার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন সরকার হিমশিম খাচ্ছিল। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নেয় বলে সে সময়কার বিভিন্ন লেখা ও স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। ত্রাণসামগ্রী প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছানোর বদলে পথেই তা চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল ব্যাপক।
দুর্নীতি ও চোরাচালান দমনে একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের অনেক স্থানীয় নেতা-কর্মীও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দলীয় নেতাদের সংঘাত বাধে, আর দলীয় চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণার জন্ম দেয় যে, সরকার নিজ দলের অনিয়ম বন্ধে প্রকৃতপক্ষে আন্তরিক নয়। ফলে দুর্নীতি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। এমনকি সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে খাদ্যশস্য লুটের ঘটনাও সে সময়ের সংবাদপত্রে ছবিসহ প্রকাশিত হয়েছিল, আর পরিবহনের সময় বিপুল পরিমাণ শস্য পথেই উধাও হয়ে যাওয়ার খবরও ছাপা হয়েছিল। একটি প্রভাবশালী দৈনিকের সম্পাদকীয়তে তখন লেখা হয়েছিল, সমাজের প্রতিটি স্তর দুর্নীতির শিকার, এমনকি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত শত শত চেকও আত্মসাৎ করা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি: দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দ্রুত খারাপ হতে থাকে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় প্রতিদিনই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছিল। বাড়িঘরের পাশাপাশি ট্রেন ও নৌযানেও নিয়মিত ডাকাতির খবর প্রকাশিত হতো। ১৫ আগস্টের মাত্র চার দিন আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ ছিল, উত্তরাঞ্চলের একটি রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী ট্রেনে ডাকাতির সময় শতাধিক গুলি ছোড়া হয়, যাতে দুই যাত্রী নিহত ও অন্তত বাইশজন আহত হন।
চরমপন্থী দমন অভিযান: ১৯৭৫ সালের শুরুতে একটি চরমপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতাকে পুলিশি অভিযানে হত্যা করা হলে সংগঠনটি সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালায়, যেখানে নিয়মিতভাবে গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার ও গোলাগুলিতে চরমপন্থীদের নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হতো। শেখ মুজিব নিহত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে প্রকাশিত এক খবরে জানানো হয়েছিল, ঝিনাইদহের একটি এলাকায় অভিযানের সময় গোলাগুলিতে চার চরমপন্থী নিহত ও একজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
প্রকৃতির প্রতিকূলতা: আগের বছরের দুর্ভিক্ষের ক্ষত তখনো শুকায়নি। কৃষকদের আরও বেশি জমিতে ধান চাষে উৎসাহিত করা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই দেখা দেয় খরা, যাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এর সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই আবার শুরু হয় টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢল, যার ফলে সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। এতে ফসলহানির পাশাপাশি প্রাণহানি এবং পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বেড়ে যায়।
সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষোভ: বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সে সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও অসন্তোষ জমছিল। দলীয় চাপে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তে অনেক তরুণ কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা মেনে নিতে না পারা এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ বিরোধও অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে। এ ছাড়া একটি বিশেষ আধা-সামরিক বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্র ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গড়ে তোলার গুজব সেনাবাহিনীর সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। কিছু তরুণ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনাও ক্ষোভের আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে আসে।
সরকারের দুর্নীতিবিরোধী শেষ অভিযান: বিশ্লেষকদের মতে, শাসনামলের শেষ দিকে দুর্নীতির কারণে জনসমর্থন কমে যাওয়ার বিষয়টি শেখ মুজিব নিজেও উপলব্ধি করেছিলেন। এ কারণে নিহত হওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক অভিযান শুরু হয়, যাতে অনেককে সাময়িক বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। এরই মধ্যে একটি সরকারি সংস্থার তিন কর্মকর্তাকে ভুয়া নথি ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার করার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। এর কিছুদিন আগে দুর্নীতির অভিযোগে একজন প্রতিমন্ত্রীকেও পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল, যা সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
অভ্যুত্থানের নীলনকশা: অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত হন একজন সেনা কর্মকর্তা, যিনি একটি রেজিমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিকল্পনাটি সাজিয়ে অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দেশের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রতিবেশী দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার ধারণা তাঁকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল বলে সমসাময়িক লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমে তিনি এই পরিকল্পনা তাঁর নিকটাত্মীয় আরেকজন সেনা কর্মকর্তাকে জানান, আর দুজনে মিলে ১৫ আগস্টকেই কার্যকর করার দিন হিসেবে বেছে নেন।
চাকরিচ্যুত ও জোরপূর্বক অবসরে পাঠানো বেশ কয়েকজন ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা পরে এই পরিকল্পনায় যুক্ত হন, সঙ্গে যোগ দেন একজন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাও। পরিকল্পনাকারীরা আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন, তবে তাঁদের মধ্যে কেবল একজন মন্ত্রীর কাছ থেকেই ইতিবাচক সাড়া মেলে। জানা যায়, ওই মন্ত্রী তখনকার শাসনব্যবস্থার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং পরিবর্তনের পথ খুঁজছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক হয়, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর তিনিই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেবেন।
শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি: ঘটনার আগের দিন অভ্যুত্থানকারীরা রাষ্ট্রপতির বাসভবন ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন। মামলার এক সাক্ষীর বরাত অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট বিকেলে একজন সেনা কর্মকর্তাকে মোটরসাইকেলে বাসভবনের সামনে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়, আর আরেকজন কর্মকর্তাকেও একই এলাকায় দেখা যায়। রাতে নিয়মিত মহড়ার অজুহাতে ট্যাংক, অস্ত্র ও সেনা সদস্যদের নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে সমবেত হন অভ্যুত্থানকারীরা। দায়িত্ব বণ্টনের পর ভোররাতে তাঁরা বাসভবনে হানা দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে পরিবারসহ হত্যা করেন।
পরবর্তী গোয়েন্দা তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার রাতে বাসভবনটির নিরাপত্তা ছিল তুলনামূলক দুর্বল, বরং সে সময় বাড়তি নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়—কারণ পরদিন সকালে সেখানে রাষ্ট্রপতির যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে আগের রাতে কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছিল, যদিও এর সঙ্গে কারা জড়িত তা স্পষ্ট হয়নি। এদিকে বাসভবনের নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদও ছিল না বলে তদন্তে উঠে আসে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগস্টের কয়েক মাস আগেও একবার রাষ্ট্রপতির ওপর হামলার চেষ্টা হয়েছিল, তবে সে খবর তখন প্রকাশ্যে আসতে দেওয়া হয়নি। একটি টেলিভিশন স্টেশন পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে সেই হামলা হয়েছিল বলে মার্কিন দূতাবাসের একটি গোপন বার্তায় উল্লেখ ছিল, যদিও হামলাকারীদের পরিচয় জানা যায়নি। ঘটনাটি জনসাধারণের কাছে প্রকাশ না করতে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদমাধ্যমগুলোকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলেও ওই বার্তায় জানানো হয়।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্নীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ—এই সব কিছুর জটিল সমন্বয়েই তৈরি হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির পটভূমি, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়।

