প্রতিবছর ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ঝক্কি কমাতে এর মেয়াদ বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার দাবি জানিয়েছেন রাজধানীর ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি নিবন্ধন ও নবায়ন প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল ও হয়রানিমুক্ত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে একটি বাণিজ্য সংগঠনের কার্যালয়ে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, আইন-শৃঙ্খলা, যানজট পরিস্থিতি ও ট্রেড লাইসেন্স সেবা নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি ওঠে আসে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভাতেই একটি বিশেষ ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করা হয়।
সভায় শুধু লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানোর দাবিই নয়, উঠে আসে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ—নবায়ন ফি কমানো, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা, যানজট ও জলাবদ্ধতা দূর করা, তিন চাকার যানে নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট চালু, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এসব দাবি পূরণে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, বারবার অফিসে যাওয়া-আসা এবং বিভিন্ন ধাপে দীর্ঘসূত্রতার কারণে তাঁদের যথেষ্ট সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। এই দুর্ভোগ কমাতেই পাঁচ বছর মেয়াদি লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অটোমেশনের আওতায় আনার দাবি তোলেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের সভাপতি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স ব্যবসা পরিচালনার অন্যতম মৌলিক দলিল হলেও নিবন্ধন ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় তথ্যের অপ্রতুলতা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে অস্পষ্টতা এবং বারবার কার্যালয়ে যাতায়াতের কারণে উদ্যোক্তারা প্রায়ই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তিনি এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু এবং একাধিক বছরের জন্য লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দেন।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আশ্বস্ত করে বলেন, সেবা নিতে এসে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেবা দিতে ব্যর্থ হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্যে, সাম্প্রতিক সময়ে সেবা প্রদানে যে ধীরগতি দেখা গিয়েছিল, তার একটি বড় কারণ ছিল একদল প্রতারকের নকল ট্রেড লাইসেন্স তৈরির ঘটনা। এসব প্রতারক নকল লাইসেন্স বানিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ আদায় করছিল বলে অভিযোগ পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
লাইসেন্স ফি প্রসঙ্গে প্রশাসক জানান, নতুন লাইসেন্স ও নবায়নের নির্ধারিত ফির সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন চার্জ যুক্ত থাকে। এসব চার্জ কমানো গেলে সামগ্রিক ফিও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, সিটি করপোরেশনের আওতায় বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ ট্রেড লাইসেন্স চালু আছে, যদিও এই এলাকায় প্রকৃত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তাই নতুন লাইসেন্স গ্রহণ ও পুরোনো লাইসেন্স যথাসময়ে নবায়নের মাধ্যমে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, তাদের আওতাধীন এলাকায় প্রায় তিনশ ধরনের ব্যবসার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ ছেচল্লিশ হাজারের বেশি ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা, যা অর্জনে ব্যবসায়ীসহ নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সার্বিকভাবে সভার আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর করে একে ব্যবসাবান্ধব করে তোলার একটি সম্মিলিত প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—যেখানে প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার, উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

