দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও একাধিক প্রার্থীর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থীই নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় আগামী বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা।
এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। ফলে একক প্রার্থীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাম্প্রতিক ধারার বাইরে গিয়ে এবার সংসদ সদস্যদের ভোটেই চূড়ান্ত হবে রাষ্ট্রপতি পদে কে আসছেন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল ৪টায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ।
২০ আগস্ট ভোটগ্রহণ
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলবে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের প্রস্তুতি নিয়েছে কমিশন।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ভোটের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ভোটগ্রহণের দিন ব্যালট পেপার কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে। ব্যালট পেপার সাদা কাগজে কালো অক্ষরে ছাপানো হবে।
ভোট শেষ হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফলাফল প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোটগ্রহণের পর কত দ্রুত ফলাফল জানানো যায়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ভোট দেবেন ৩৪৯ সংসদ সদস্য
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের। একটি আসন শূন্য থাকায় মোট সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৩৫০-এর পরিবর্তে ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন।
আদালতের নির্দেশে নির্বাচিত প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় চট্টগ্রাম-৪ আসন বর্তমানে শূন্য রয়েছে। ফলে ওই আসনের সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাই এবারের নির্বাচনে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থনই ফল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কীভাবে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ শুরুর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।
প্রতিটি ব্যালট পেপারে দুটি অংশ থাকবে। এর একটি কাউন্টারফয়েল এবং অন্যটি মূল ব্যালট অংশ। কাউন্টারফয়েলে সংসদ সদস্যের পরিচয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। সেখানে ক্রমিক নম্বর, সংসদ সদস্যের নাম এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে দেওয়া বিভাগীয় নম্বরসহ তিনটি তথ্য থাকবে। পাশাপাশি একটি খালি জায়গাও রাখা হবে।
ব্যালট পেপার গ্রহণের আগে নির্ধারিত স্থানে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।
এরপর ব্যালট পেপারের ডান পাশে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর নাম বাংলা বর্ণানুক্রমে মুদ্রিত থাকবে। প্রত্যেক প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে সংসদ সদস্যরা নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন।
ভোট দেওয়া শেষ হলে ব্যালট পেপার নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হবে।
প্রায় ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ প্রায় ৩৫ বছর পর একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একজন প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে হবে।
এ কারণে ২০ আগস্টের ভোট শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাও হয়ে উঠেছে।
কীভাবে তৈরি হলো নির্বাচনের পরিস্থিতি
গত ২৪ জুলাই ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এর ফলে রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির শূন্য পদে নির্বাচন আয়োজনের জন্য তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য নির্ধারিত সময় রাখা হয়।
শেষ পর্যন্ত দুই প্রার্থীর কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।
ফলাফল ঘোষণা হবে দ্রুত
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রাথমিক ফলাফল দ্রুত ঘোষণা করা হবে। এ জন্য কমিশনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কর্তা হিসেবে ভোট শুরুর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার নিয়ম সম্পর্কে অবহিত করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা হবে।
সব মিলিয়ে ২০ আগস্টের নির্বাচন হতে যাচ্ছে দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোটের ফলাফলেই নির্ধারিত হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন।

