সরকার গঠনের ছয় মাস পূর্ণ হতেই আরও বড় হলো মন্ত্রিসভা। নতুন করে পাঁচজন যুক্ত হলেন মন্ত্রিসভায়, আর একজন প্রতিমন্ত্রী পদোন্নতি পেয়ে পূর্ণ মন্ত্রী হলেন। সব মিলিয়ে গতকাল শুক্রবার চারজন নতুন মন্ত্রী এবং দুজন নতুন প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। শপথ অনুষ্ঠানের পরপরই রাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কয়েকজন সদস্যের দপ্তর বণ্টন ও পুনর্বণ্টন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
এই রদবদলের ফলে প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার মোট সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দিলে এখন পূর্ণ মন্ত্রী রয়েছেন ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। এর আগে মন্ত্রিসভার আকার ছিল ৪৮ জনের—২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে গঠিত। একই দিনে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন সদ্য সাবেক তথ্যমন্ত্রী পদমর্যাদার একজন শীর্ষ নেতা, আর সাবেক তথ্যমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন উপদেষ্টার সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে, অর্থাৎ ১০ জনই বহাল।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান নতুন রাষ্ট্রপতি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শপথ অনুষ্ঠানের একটু আগেই রাষ্ট্রপতি পদে শপথ নেন তিনি নিজে।
প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ নিয়েছিল। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এরপর থেকে একাধিকবার মন্ত্রিসভায় দপ্তর পরিবর্তন করা হয়েছে এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এবারের সম্প্রসারণ তারই সর্বশেষ ধাপ।
শপথ অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব একে একে নতুন সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন। নতুন মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ সদস্য, দলের কোষাধ্যক্ষ তথা জামালপুরের একটি আসনের সংসদ সদস্য, বান্দরবান থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য এবং জোটসঙ্গী একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান। এর মধ্যে জামালপুরের ওই সংসদ সদস্য আগে প্রতিমন্ত্রী থাকলেও এবার পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা পেয়েছেন।
নতুন দুই প্রতিমন্ত্রীর একজন একজন কারিগরি বিশেষজ্ঞ (টেকনোক্র্যাট), যিনি এর আগে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন। অপরজন গাইবান্ধার একটি আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
শপথের পর রাতেই দায়িত্ব বণ্টনের বিস্তারিত জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া নেতা আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন—তাঁর জায়গায় এই মন্ত্রণালয়ের ভার নিয়েছেন নতুন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া স্থায়ী কমিটির ওই সদস্য। জামালপুরের সংসদ সদস্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন, যে মন্ত্রণালয়ে তিনি আগে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ফলে এই মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রীকে সরিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বান্দরবানের সংসদ সদস্যকে দেওয়া হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। উল্লেখ্য, মন্ত্রিসভা গঠনের প্রায় তিন মাসের মাথায় এই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী পদত্যাগ করায় পদটি দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। জোটসঙ্গী দলের চেয়ারম্যান পেয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, আর এই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে থাকা আগের মন্ত্রীকে করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
নতুন দুই প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে কারিগরি বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এই মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যে আরেকজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্বে থাকায় এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মোট দুজন প্রতিমন্ত্রী কাজ করবেন। অন্যদিকে গাইবান্ধার সংসদ সদস্যকে দেওয়া হয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব।
সার্বিক এই রদবদল থেকে স্পষ্ট, সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই প্রশাসনিক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হলো। রাষ্ট্রপতির পদে রদবদলের কারণে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ, দীর্ঘদিন শূন্য থাকা একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টন এবং জোট রাজনীতির সমীকরণ রক্ষা—এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখেই মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের ছয় মাসের মাথায় এত বড় পরিসরে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন সরকারের প্রশাসনিক অগ্রাধিকার ও জোট ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে।

