আমন মৌসুম। ধানের জমিতে সারের প্রয়োজন। কিন্তু সেই সার পেতেই যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে কৃষকের জীবন। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর কাজীহাটা গ্রামের কৃষক বাবলু। এবার ১০ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। জমির জন্য ইউরিয়া দরকার, কিন্তু নিজ গ্রামের পরিবেশকের কাছে সার পাননি। গত মঙ্গলবার সকালে তিনি ছুটে এসেছিলেন পাশের দামকুড়া বাজারের দেওপাড়া ইউনিয়নের পরিবেশকের দোকানে। সেখানে লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁকে দেওয়া হচ্ছিল মাত্র ২০ কেজি সার। অভিমানে বাবলু সেই সারও না নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।
শুধু বাবলু নন, রাজশাহী ও যশোরের শত শত কৃষক একই অবস্থার মুখোমুখি। এক দোকানে ডিএপি আছে তো ইউরিয়া নেই, অন্য দোকানে টিএসপি আছে তো ডিএপি নেই। আবার যেখানে সার পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দাম পড়ছে বেশি। কৃষকেরা অভিযোগ করেছেন, সরকার নির্ধারিত পরিবেশকেরা ভর্তুকির সার বাইরে কালোবাজারে বিক্রি করছেন। পরে সেই সার খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সরকারি দামের চেয়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া ১০-১৫ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে কৃষকদের।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, যে পরিমাণ সার বরাদ্দ চাওয়া হয়, তা কখনোই পাওয়া যায় না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু ইউরিয়া সারের চাহিদা দেওয়া হয়েছিল ৩ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ মেট্রিক টন। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৭১ হাজার ১০৯ মেট্রিক টন। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি সার কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জটিলতায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও সার আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
এই সংকট নিরসনে সরকার কী করছে? রাজশাহীতে গত তিন দিনে চারজন পরিবেশককে মোট ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যশোতেও দুই পরিবেশককে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু জরিমানাই কি যথেষ্ট? কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাঁরা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করার শাস্তি জরিমানাই কি যথেষ্ট?।
এদিকে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে সারের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কৃষকরা। ঘণ্টাব্যাপী এই কর্মসূচিতে অংশ নেন তিন শতাধিক কৃষক। তারা স্লোগান দেন ‘সার দে কৃষি বাঁচাও’, ‘বাঁচলে কৃষি বাঁচবে দেশ’। কালীগঞ্জের সারের ডিলার সোহরাব হোসেন জানান, তারা যতটুকু সার পাচ্ছেন, তাই সরকারি দামে বিক্রি করছেন। কিন্তু টিএসপি সারের বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় ৬০-৭০ শতাংশ কম।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সার সিন্ডিকেট থেকে কৃষকের মুক্তি আছে কি? বছরের পর বছর ধরে এই জিম্মিদশা চলছে। কৃষকেরা ঋণ করে ফসল ফলাবেন, প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, অথচ ফসল বিক্রি করার সময় দাম পাবেন না, এই দুষ্টচক্র থেকে কৃষককে বের করে আনতে হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভর্তুকি আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। কিন্তু ভর্তুকি বাড়লেও তা যদি কৃষকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে সেই ভর্তুকির কোনো অর্থ নেই।
সার নিয়ে কৃষকের এই দুর্দশার অবসান ঘটাতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। গ্যাস সংকট সমাধান, দেশীয় সার কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, এই তিনটি পদক্ষেপ নিতে পারলেই হয়তো কৃষকেরা একদিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন। ততদিন পর্যন্ত সার সিন্ডিকেটের কাছে কৃষকরা জিম্মি হয়ে থাকবেন, এই বাস্তবতা বদলানো কঠিন।

