বাংলাদেশ কোনো চুক্তি, জোট বা বহুপক্ষীয় কাঠামোয় যুক্ত হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
শনিবার (২২ আগস্ট) সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের ‘বাংলাদেশ প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে ঘিরে সম্ভাব্য কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ অবস্থান জানান।
শামা ওবায়েদ বলেন, কোনো চুক্তি বা বহুপক্ষীয় সংস্থায় বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, তা নির্ধারণের প্রধান বিবেচনা হবে এতে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং দেশের মানুষের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে।
অর্থাৎ কোনো দেশের চাপ, আঞ্চলিক সমীকরণ কিংবা বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। দেশের প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করেই প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি।
সম্প্রতি কয়েকটি বিদেশি গণমাধ্যমে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে ঘিরে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক কিংবা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে নানা আলোচনা সামনে আসে।
তবে এ ধরনের সংবাদকে সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি বা বহুপক্ষীয় কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে দেশের গণমাধ্যমই সবার আগে বিষয়টি জানতে পারবে। তাই পাকিস্তান বা ভারতের গণমাধ্যমে কী প্রকাশিত হচ্ছে, সেটিকে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিবেচনায় আনার প্রয়োজন নেই।
এ বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার মূলত পররাষ্ট্রনীতিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিভিন্ন দেশের নতুন নতুন সমীকরণ তৈরি হলেও বাংলাদেশ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই অবস্থান নির্ধারণ করবে—এমন বার্তাই দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির কথা তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা কোনো আন্তর্জাতিক কাঠামোয় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিশেষ করে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিরোধে জড়ানোর বদলে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ে তিনটি নতুন শাখা চালু করা হয়েছে।
এ ছাড়া অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলায় একাধিক আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়কারী দল কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক বিদেশে কাজ করেন। ফলে বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করা, অনিয়মিত অভিবাসন কমানো এবং বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলো পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সামনের দিনগুলোতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের চাপ আরও বাড়বে বলেও জানান শামা ওবায়েদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক কার্যক্রমে বাংলাদেশের সক্রিয়তা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে দেশের স্বার্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে গুরুত্বপূর্ণ সময় আসছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকেও স্বাগত জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ।
হুমায়ুন কবিরের আগে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিরোধী দলে থাকার সময়ও তিনি পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কাজ করেছেন। ফলে তার অভিজ্ঞতা মন্ত্রণালয়ের বহুপক্ষীয় কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন শামা।
তিনি বলেন, দল হিসেবে সমন্বিতভাবে ভালোভাবে কাজ করতে পারলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহুপক্ষীয় কার্যক্রম আরও গতি পাবে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে ঘিরে সম্ভাব্য কোনো জোট বা কাঠামো নিয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি সরকার। বরং সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, ভবিষ্যতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত এলে তার কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থ। বিদেশি গণমাধ্যমের আলোচনা নয়, ঢাকার নিজস্ব মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্তই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখবে।

