বিশেষ প্রতিবেদন
রাত গভীর হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলো আরও নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে। ঘন অরণ্য, কুয়াশা আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের কারণে অনেক এলাকায় দিনের আলোতেও চলাচল কঠিন। সীমান্তের কাছাকাছি কিছু অঞ্চল তো আরও দুর্গম। এই ভৌগোলিক বাস্তবতাই দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।
এই পাহাড় ঘিরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, সশস্ত্র তৎপরতা, সীমান্তপারের যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার উঠে আসে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং সংগঠনটির নেতা সন্তু লারমার নাম। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, ভারতের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ এবং পাহাড়ের সশস্ত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি সামনে এসেছে।
তবে এসব দাবির সবকটির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ জনসমক্ষে নেই। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু সন্তু লারমাকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে- পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার পেছনে আসলে কোন কোন শক্তি কাজ করছে এবং এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কাঠামো ভবিষ্যতে কোন দিকে যাচ্ছে?

সীমান্তের ওপারে যোগাযোগের অভিযোগ
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা- রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- বাংলাদেশের ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর অন্যতম। একদিকে ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা, অন্যদিকে মিয়ানমারের সীমান্ত। ফলে এই অঞ্চলকে ঘিরে সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বা সন্তু লারমার ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে- এমন অভিযোগ বহুদিনের। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর ভারত সফর এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগের দাবি করা হলেও এসব সফরের প্রকৃতি বা আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত।
আর এখানেই তৈরি হয় বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক নেতা বা সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় থাকা কোনো ব্যক্তি যদি নিয়মিতভাবে বিদেশি পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে সেই যোগাযোগের স্বচ্ছতা কতটুকু? রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এ বিষয়ে কী জানে? আর জানলে তাদের অবস্থান কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট না হওয়ায় পাহাড়ের রাজনীতি নিয়ে সন্দেহ আরও গভীর হয়।
অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছে অস্ত্র থাকার বিষয়টি নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত হয়েছে। শান্তি চুক্তির পরও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অস্ত্র ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে আধুনিক অস্ত্র, নাইট ভিশন সরঞ্জাম কিংবা উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা থাকার নানা দাবি সামনে এসেছে। এসব অস্ত্র কোথা থেকে আসে- এই প্রশ্নের উত্তরও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকলে তা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় থাকে না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকার প্রশ্ন।
ভারতের মিজোরাম ও আসাম সীমান্তের দুর্গম এলাকায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকার অভিযোগও বিভিন্ন মহল থেকে করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি কেন্দ্র বা কার্যক্রমের স্বাধীন প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
কারণ একটি বিষয় পরিষ্কার- সীমান্তের দুই পাশে সশস্ত্র তৎপরতার কোনো যোগসূত্র থাকলে তা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সন্তু লারমার রাজনৈতিক অবস্থান
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ের রাজনীতিতে সন্তু লারমার অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই পদটি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এখানে আরেকটি বিষয় নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে- সন্তু লারমার বাংলাদেশের নাগরিকত্বের সময়কাল ও তাঁর সরকারি পদে থাকার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন।

কিছু সূত্রের দাবি, তিনি ২০২১ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন এবং পরে নাগরিকত্ব পান। এই দাবি সত্য হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- এর আগে তিনি কোন আইনগত অবস্থানের ভিত্তিতে আঞ্চলিক পরিষদের নেতৃত্ব দিয়েছেন?
তবে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা সামনে না এনে এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া যায় না। বিষয়টি তাই আরও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে।
শান্তি চুক্তির পরও কেন অস্থিরতা?
১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং পাহাড়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু চুক্তির প্রায় তিন দশক পরও পাহাড় পুরোপুরি শান্ত নয়।
বিভিন্ন পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, সংঘাত, হত্যাকাণ্ড, অপহরণ এবং সীমান্তপারের যোগাযোগের অভিযোগ এখনো রয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমি, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিরোধও রয়ে গেছে।
ফলে শান্তি চুক্তি যে সমস্যার সমাধান করার কথা ছিল, তার সবগুলো সমাধান হয়েছে কি না- এ প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।
ভূমি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিরোধ
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটের অন্যতম কেন্দ্রে রয়েছে ভূমির প্রশ্ন।
সারা বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থার সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থার কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির ঐতিহাসিক প্রভাব এখনো এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও ভূমি ব্যবস্থায় রয়েছে।
পাহাড়ে প্রচলিত হেডম্যান ও কারবারি ব্যবস্থা, প্রথাগত ভূমি অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ভূমি ব্যবস্থাপনার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তা বহুদিনের।
একদিকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ তাদের ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার সংরক্ষণের দাবি করে। অন্যদিকে বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মনে করে, দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের ভূমি অধিকার ও বসবাসের ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়।
এই দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে পাহাড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানো কঠিন।
‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে পরিচয়ের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের জাতিগত পরিচয়, সাংস্কৃতিক অধিকার ও ঐতিহ্য রক্ষার দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ এবং ‘আদিবাসী’- এই শব্দগুলোর ব্যবহার নিয়েও রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক রয়েছে।
একটি পক্ষ মনে করে, আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘আদিবাসী’ পরিচয় তাদের ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকারের দাবিকে শক্তিশালী করে। অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ আশঙ্কা করে, এই পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করা হতে পারে।
এখানে আবেগের পরিবর্তে প্রয়োজন সংবিধান, আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে স্পষ্ট অবস্থান।
কারণ পাহাড়ের মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা- দুটি বিষয়কে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।
ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা হলে ভারতের ভূমিকার প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্য বাংলাদেশের পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অতীতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে সীমান্তপারের যোগাযোগের ইতিহাসও রয়েছে।
এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে পাহাড়ের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর যোগাযোগ নিয়ে উদ্বেগ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
তবে ভারত সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে- এমন অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য, নথি বা স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজন। রাজনৈতিক বক্তব্য বা অপ্রমাণিত সূত্রের ভিত্তিতে এমন গুরুতর অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
মোসাদ ও পশ্চিমা শক্তির অভিযোগ
সন্তু লারমার সঙ্গে ভারতের মাটিতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের যোগাযোগের মতো দাবিও বিভিন্ন আলোচনায় এসেছে। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পশ্চিমা রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে- এমন অভিযোগও করা হয়।
কিন্তু এসব দাবির ক্ষেত্রে আরও বড় প্রশ্ন হলো- প্রমাণ কোথায়?
কোনো আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে গোপন বৈঠকের দাবি অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের তথ্য যাচাই ছাড়া সংবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হলে প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষণ করতে হলে অনুমান এবং প্রমাণকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
সেনাবাহিনীকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি বয়ান
পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক রয়েছে।
সরকারের অবস্থান হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতির মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে পাহাড়ি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর একটি অংশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। একইভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সশস্ত্র হুমকির অভিযোগ থাকলে সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা জরুরি।
একটি বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করতে অন্য বিষয়কে অস্বীকার করার পথ সমস্যার সমাধান করবে না।
কারণ, বিশ্লেষকদের দাবি, সেনাবাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে পাহাড় থেকে সরিয়ে দিতে পারলে তারা সেখানে কোনো বাধা ছাড়াই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

আসল সংকট কোথায়?
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে কেবল পাহাড়ি বনাম বাঙালি অথবা সেনাবাহিনী বনাম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা কঠিন।
এখানে রয়েছে ভূমি বিরোধ, জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতা, সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রাজনীতি- সবকিছুর সমন্বিত প্রভাব।
আর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা বাঙালি- যে পরিচয়েরই হোক, পাহাড়ের সাধারণ মানুষ মূলত নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং স্থিতিশীল জীবন চায়।
তাদের কাছে রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্তানদের ভবিষ্যৎ।
এখন রাষ্ট্রের করণীয়
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটের সমাধান শুধু সামরিক পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। আবার কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার কথাও বলে নিরাপত্তার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না।
প্রথমত, সীমান্তপারের সশস্ত্র যোগাযোগের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবৈধ অস্ত্র ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে যে বিরোধ রয়েছে, তার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে।

একই সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো জনগোষ্ঠীকে তাদের জাতিগত পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাস্তবতার মধ্যেই পাহাড়ের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ খুঁজতে হবে।
কারণ পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার অর্থ কেবল অস্ত্রের শব্দ বন্ধ করা নয়। এর অর্থ হলো এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী, কোনো বিদেশি শক্তি কিংবা কোনো সুবিধাভোগী রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় এখনো নীরব। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে জমে আছে বহু বছরের ক্ষোভ, অবিশ্বাস এবং অনিশ্চয়তা।
রাষ্ট্রের সামনে তাই প্রশ্ন একটাই- এই নীরবতাকে কি স্থায়ী শান্তিতে পরিণত করা হবে, নাকি অবহেলা ও অস্বচ্ছতার কারণে আগামী দিনের আরও বড় সংকটের ভিত্তি তৈরি হবে?

