আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে। এর আগে গত জুলাইয়ে ঢাকা বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নিরাপত্তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে অডিটের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক)। কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগুজে নীতিমালার চেয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তব প্রয়োগই এই অডিটে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
গত ১৬ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক নিরাপত্তা স্তর পেরিয়ে একটি ব্যাগ দিল্লিগামী বিমানে উঠে যায়। ব্যাগে ছিল ৩১ রাউন্ড তাজা গুলি। ঢাকায় দুই দফা স্ক্যানিংয়েও তা শনাক্ত হয়নি। দিল্লি বিমানবন্দরে ধরা পড়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। ঘটনার তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়, একটি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এবং অন্যটি বেবিচকের সদর দপ্তরের। তদন্তে দুজন স্ক্রিনারের দায়িত্বে গাফিলতি পাওয়া গেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কমিটি ওই দুজনকে শাস্তির আওতায় আনতে বেবিচক সদর দপ্তরে লিখিত সুপারিশ পাঠিয়েছে।

এই ঘটনার কিছুদিন পরই আসছে আইকাওয়ের নিরাপত্তা অডিট। এর নাম ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম–কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচ। অডিট চলবে ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত। এ সময় বেবিচকের সদর দপ্তর, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন কাঠামো পর্যালোচনা করা হবে। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী, কার্গো ও ডাকসামগ্রী পরিবহনে নিরাপত্তা প্রটোকল ও স্ক্রিনিং ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা-ই মূলত দেখা হবে।
প্রস্তুতির অগ্রগতি নিয়ে বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মো. আসিফ ইকবাল জানান, প্রস্তুতির প্রায় ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। নিজেদের ঘাটতি খুঁজে বের করে সারাতে তিন ধাপে প্রাক-অডিট চলছে। ইতিমধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দর, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ অডিট শেষ হয়েছে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এখন এই অডিট চলছে। এসব অডিটে ছোটখাটো ঘাটতি বা অস্পষ্ট জায়গা পাওয়া গেলে মূল অডিটের আগেই ঠিক করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এবারের অডিটে বেবিচকের স্কোর ৭৫ শতাংশে উঠবে বলে আশা করছেন তিনি।
জুলাইয়ের ঘটনা নিয়ে এই কর্মকর্তার বক্তব্য হলো, বিশ্বের বড় বিমানবন্দরেও মাঝেমধ্যে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। তাঁর মতে, ওই ঘটনায় শুধু গুলি ছিল, বড় কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়নি। তাই এই একটি ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক অডিটে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে তিনি মনে করেন। তবে এমন ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়াকে তিনি স্বাভাবিক বলেছেন। তাঁর দাবি, বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা তদারকি কঠোর রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলামের মতে, আইকাও অডিটে কাগজে থাকা প্রটোকলের চেয়ে মাঠে তার প্রয়োগ বেশি গুরুত্ব পায়। অস্ত্র বা গুলি শনাক্তহীন অবস্থায় পার হয়ে যাওয়া কিংবা কর্মীদের অনিয়ম নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, আইকাও কোনো একটি বিমানবন্দর নয়, দেশের সামগ্রিক বিমান নিরাপত্তা তদারকি ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাই যাচাই করবে।
নজরুল ইসলামের মতে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি আছে। শুধু নীতিমালা বানালে চলবে না, মাঠে তার যথাযথ প্রয়োগই আসল পরীক্ষা। তিনি বেবিচকের তদারকি বাড়ানো, স্ক্যানারগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আলাদা করার ওপর জোর দেন।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কোনো ছাড় না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন এয়ারএশিয়া ও কুয়েত এয়ারওয়েজের জেনারেল সেলস এজেন্ট প্রতিষ্ঠান টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের (টাস গ্রুপ) চেয়ারম্যান কেএম মজিবুল হক। তাঁর মতে, নিরাপত্তায় থাকতে হবে শূন্য সহনশীলতা। তৃতীয় টার্মিনালে যে আধুনিক সরঞ্জাম বসানো হচ্ছে, ধাপে ধাপে পুরোনো টার্মিনালগুলোতেও সেই মানের ব্যবস্থা আনা দরকার। একই সঙ্গে জনবলকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
মজিবুল হক আরও বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হলে নিরাপত্তার মান আরও উন্নত করতে হবে। এটি কোনো একক সংস্থার কাজ নয়। এয়ারলাইনস, বেবিচক ও বিমান বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নির্দিষ্ট এসওপি অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিয়ে তা বাস্তবে নিশ্চিত করা দরকার। তাঁর মতে, নিরাপত্তায় একটি ভুলও বড় সমস্যা ডেকে আনতে পারে। তাই বিষয়টিকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে দেখে আন্তর্জাতিক নিয়ম মানাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।
এই অডিটের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এভিয়েশন ক্যাটাগরি-১ মর্যাদা পাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই। বেবিচক জানিয়েছে, ক্যাটাগরি-১–সংক্রান্ত সেফটি অডিট হওয়ার কথা আগামী বছর।
অডিটের আগে অবশ্য একটি ইতিবাচক ফল পেয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্টের (ডিএফটি) সর্বশেষ নিরাপত্তা অডিটে শাহজালাল বিমানবন্দর পেয়েছে ৯৪ শতাংশ এবং ওসমানী বিমানবন্দর ৯৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের মূল্যায়নে এ দুটির স্কোর ছিল যথাক্রমে ৯৩ ও ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে শাহজালালের স্কোর ১ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং ওসমানীর ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। কার্গোসংক্রান্ত অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল্যায়নে শতভাগ কমপ্লায়েন্সও মিলেছে।
বেবিচকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ফল আইকাও অডিটের প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে ডিএফটির পর্যবেক্ষণ থেকে ঘাটতি চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ ঝুঁকির কার্গো ও ডাক ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। ফলে ইউরোপগামী কার্গো ও ডাকসামগ্রীর ক্ষেত্রে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সময় ও ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় এখন অনুমোদনহীন ড্রোন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরে ‘এয়ারপোর্ট ইমার্জেন্সি এক্সারসাইজ (ফায়ার) ২০২৬’ অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, শিগগিরই আইকাও অডিট হবে এবং তাদের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত। তাই সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলোতে আগে থেকেই নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি ভিআইপি ও সিআইপিসহ সবার জন্য একই নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণের কথাও বলেন।
মন্ত্রী আরও জানান, বিমানবন্দরকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করে অননুমোদিত ড্রোন ঠেকাতে অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও স্ক্যানার রাখার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরে দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম কয়েক মিনিটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস, বিমানবন্দর পরিচালনা, নিরাপত্তা ও চিকিৎসা দলের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ ও সমন্বয় নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে অডিটের আগে বেবিচকের সামনে দুটি দিক স্পষ্ট। একদিকে ডিএফটির ভালো স্কোর ও কার্গোতে শতভাগ কমপ্লায়েন্স তাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা। অন্যদিকে জুলাইয়ের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, স্ক্রিনিং পর্যায়ে মানবিক ও যান্ত্রিক ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। অডিটে সফল হতে হলে কেবল প্রস্তুতির শতাংশ নয়, মাঠপর্যায়ে নিয়মের কঠোর প্রয়োগ, সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং প্রশিক্ষিত জনবলই নির্ধারক হবে।

