প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে নাটকীয়তা চলছে, তা কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফরের সূচি নির্ধারণের প্রশ্ন নয় এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা।
গত শুক্রবার নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ঘোষণা এলো, শনিবারের নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান স্থগিত থাকবে, কারণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা জানানোর প্রস্তুতি চলছে। মাত্র এক ঘণ্টার মাথায় সেই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই। এই একটি ঘটনাই যেন প্রতীকীভাবে বলে দিচ্ছে, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক এখন কতটা টালমাটাল আর অনিশ্চিত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
সফরের পটভূমি ও জটিলতা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার পতন এবং তাঁর ভারতে আশ্রয় গ্রহণের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে চিড় ধরেছিল, তা আজও পুরোপুরি সারেনি। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান ইতিমধ্যে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন, কিন্তু ভারত সফর এখনো বাকি আর এই বিলম্বই বহু অর্থবহ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বিপক্ষীয় সফর এবং আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানালেও, ঢাকা থেকে বারবার বলা হচ্ছে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সম্প্রতি জানিয়েছেন, সফরের প্রশ্নে ঢাকা এখনো শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের সাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
এই একটি বাক্যেই আসলে গোটা সংকটের সারবস্তু ধরা পড়ে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি এখন আর কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি স্পর্শকাতর অধ্যায়। জুলাই অভ্যুত্থানে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের প্রেক্ষাপটে, ভারতের মাটি থেকে সাবেক শাসকের সাংবাদিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ বা রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে গভীর ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশবিরোধী যেকোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্পেস দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে।
তিন শর্তের রাজনীতি
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা থেকে দিল্লিকে বেশ কিছু শর্তের কথা জানানো হয়েছে সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে। ভারতীয় গণমাধ্যম এগুলোকে ‘কঠিন শর্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, এমনকি একটি প্রভাবশালী পত্রিকার শিরোনামেই উঠে এসেছে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোই বাংলাদেশের জন্য একরকম ‘রেড লাইন’। এ ধরনের শর্তনির্ভর কূটনীতি সাধারণত দুর্বল পক্ষের কৌশল হিসেবে দেখা হলেও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি বরং নতুন এক আত্মবিশ্বাসেরও প্রতিফলন। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনমতকে উপেক্ষা করে কোনো সরকারের পক্ষে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, তাড়াহুড়ো নয় বরং পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতেই উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে সফর হবে।
এই অবস্থান একদিকে যেমন আত্মমর্যাদার প্রকাশ, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকিরও। দীর্ঘসূত্রতা সম্পর্কের বরফ গলাতে যেমন বাধা দিতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে সরকারের রাজনৈতিক পুঁজি ক্ষয় করতে পারে। দুই বিপরীত ঝুঁকির মাঝামাঝি এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ঢাকার কূটনৈতিক দক্ষতার আসল পরীক্ষা।
দিল্লির অবস্থান ও বার্তা
ভারতের দিক থেকেও বার্তা সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বারবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে একই ধরনের কূটনৈতিক ভাষায় উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। এই মুহূর্তে সফর নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। অথচ একই সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তারিখ, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার প্রস্তুতির মহড়ার খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। এই স্ববিরোধিতা থেকে স্পষ্ট, দিল্লির অভ্যন্তরেও এই সফর নিয়ে দোদুল্যমানতা কাজ করছে। কূটনৈতিক বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের টানাপোড়েনে ভারত সরকার এখনো একটি সুস্পষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
তবে এটাও সত্য যে, নতুন বাংলাদেশ সরকার গঠনের পরপরই দিল্লি দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, এবং সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ভারতকে তাঁকে ‘সম্মানজনক স্বাগত’ জানানোর প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা গেছে। অর্থাৎ সদিচ্ছার অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের পথে জটিলতা প্রচুর। ঢাকায় নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, তা সফরের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত হতে পারেনি।
শুধু সফর নয়, নীতির পরীক্ষা
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, তারেক রহমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এখন এক বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি। ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তনই দেখেনি, দেখেছে জনমতের এক নতুন শক্তি, যা প্রতিবেশী সম্পর্কের প্রশ্নেও সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করছে। অতীতের মতো নীরবে সম্পর্ক পরিচালনা করার সুযোগ আর নেই। একই সঙ্গে এই বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না যে, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন, বাণিজ্য সহজীকরণ, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা এসবই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তব ক্ষেত্র।
তাই বিষয়টি এমন নয় যে বাংলাদেশ ভারতবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে; বরং প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশ কীভাবে সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করতে পারে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের মন্তব্যেও এই সুরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যেতেই পারেন, তবে তা হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। এই অবস্থান এখন কার্যত জাতীয় ঐকমত্যে পরিণত হয়েছে।
পরিশেষে
তারেক রহমানের ভারত সফর শেষ পর্যন্ত হবে কি না, হলে কবে হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই একটি বার্তা স্পষ্ট: বাংলাদেশ এখন আর কেবল প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং শর্তনির্ভর ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কূটনীতির পথে হাঁটার চেষ্টা করছে। এই পথ দীর্ঘ, জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি তা সত্যিকারের সমমর্যাদাভিত্তিক এক নতুন সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করতে পারে, তাহলে বর্তমান অনিশ্চয়তা হয়তো একদিন ইতিহাসে একটি প্রয়োজনীয় ক্রান্তিকাল হিসেবেই বিবেচিত হবে। আপাতত সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে ঢাকা ও দিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, আস্থা পুনর্গঠনের এই সূক্ষ্ম ও ধীর প্রক্রিয়ায় প্রতিটি সিদ্ধান্তই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
- মিজান মাজনুন
আইনজীবী ও সাংবাদিক

