রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চারজন হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে ডাকাতির পর হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হলেও পরে হত্যার কারণ হিসেবে সামনে আনা হয় ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি। এরই মধ্যে ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক ডোমের বরাতে মা ও মেয়ের ভ্যাজাইনাল সোয়াবে বীর্য পাওয়ার দাবি সামনে এসেছে।
যদিও এ দাবির কোনো সরকারি বা চিকিৎসা প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে পুলিশের বয়ান, ফরেনসিক তথ্য ও ঘটনাস্থলের বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
একই পরিবারের চারজনকে হত্যা
২২ আগস্ট ২০২৬ শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, তাঁদের কন্যা ও কনিষ্ঠ পুত্রের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ ঘটনাটিকে ডাকাতির পর হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখেছিল। তবে পরদিন ২৩ আগস্ট রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ ঘটনার ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দেন।
পুলিশ কমিশনারের দাবি, প্রতিবেশী দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ওই বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। তাঁরা ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করেন। দুই তরুণকে আটকের পর একই দিন বিকেলে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ানো হয়। পরে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। এমনটাই দাবি করেছে, পুলিশ প্রশাসন।
স্বজনেরা মানছেন না পুলিশের বয়ান
পুলিশের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন নিহত পরিবারের স্বজনেরা। বিশেষ করে প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী এবং পরিবারের জামাতা বিশ্বজিৎ রায় পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রকাশ্যেই সংশয় জানিয়েছেন।
তাঁদের প্রশ্ন, দুই তরুণের শারীরিক সামর্থ্য দিয়ে একই পরিবারের চারজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা কতটা সম্ভব? তাঁদের মতে, পুলিশের দেওয়া ঘটনার বিবরণে এখনো একাধিক বিষয় অস্পষ্ট রয়েছে।
স্বজনদের এসব প্রশ্ন কোনোভাবেই নিজেরা আইনি প্রমাণ নয়। তবে চারজন মানুষ একই ঘটনায় নিহত হওয়ার পর তদন্তের বয়ানের সঙ্গে বাস্তবতার সামঞ্জস্য যাচাই করার ক্ষেত্রে এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া, এই ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিশিষ্টজনরা। তাদের অভিযোগ, দুই যুবককে গ্রেফতার করে চার হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে পুলিশ। এটিকে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করেছেন তারা।
অন্যদিকে, সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাসের ভাষ্য, পুলিশ তাকে আটকের সময় সিদ্ধার্থের পরনে ছিল শুধু কালো-ঘিয়া রঙের একটি গেঞ্জি, পরে দেখি শার্ট! – এই বিষয়টিও তদন্তের বাইরে রাখার বিষয় নয়।
এলাকাবাসীও বিক্ষোভ করেন। তারা বলেন, দুজনের পক্ষে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়। তাই সঠিক তদন্তের মাধ্যমে মূল ঘটনা উদঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানায়।
প্রথমে ডাকাতি, পরে ইয়াবা সেবনে বাধা
ঘটনার শুরুতে ডাকাতির পর হত্যাকাণ্ডের ধারণা সামনে এলেও পরদিনই হত্যার কারণ হিসেবে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
একই পুলিশ সংবাদ সম্মেলনকে ভিত্তি করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও ঘটনার বিবরণে কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। কোথাও ডাকাতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে আবার কোথাও ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অবশ্য এসব পার্থক্যের কিছু অংশ প্রতিবেদকের সংক্ষিপ্তকরণ, অনুবাদ বা উপস্থাপনার কারণে হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তদন্তের প্রাথমিক ধারণা থেকে চূড়ান্ত ব্যাখ্যায় দ্রুত পরিবর্তন আসায় তদন্তের বয়ান কতটা স্থির ছিল, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে।
ডোমের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘গোপন’ তথ্য
ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্ট একজন ডোমের বরাতে জানা যায়, মা ও মেয়ে—উভয়ের ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা যৌন নির্যাতনের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
এই দাবি একজন ডোমের বক্তব্য মাত্র—এখনো কোনো সরকারি বা চিকিৎসা প্রতিবেদনে এর নিশ্চয়তা মেলেনি, ফলে একে যাচাই-নিরপেক্ষভাবেই গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া, ভাষ্যদাতা ‘ডোম’ একাত্তরের সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দাবি করেন, ডাঃ-এর পক্ষ থেকে ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় বীর্যের উপস্থিতি-সংক্রান্ত কোনো বিষয় কাউকে বলতে সরাসরি নিষেধ ছিল। – কিন্তু, কেন?
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশের সরকারি ভাষ্যে এই সংক্রান্ত কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি জবাব না দিয়ে ঘটনাটিকে “স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড” বলে উল্লেখ করে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।
চিকিৎসক কেন সরাসরি উত্তর দিলেন না?
আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে ডোমের বক্তব্যের সূত্র ধরে।
ওই ডোম একজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় দাবি করেন, চিকিৎসকের পক্ষ থেকে ভ্যাজাইনাল সোয়াবে বীর্যের উপস্থিতি-সংক্রান্ত কোনো তথ্য কাউকে জানাতে তাঁকে সরাসরি নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু, কেন?
ফরেনসিক তথ্য তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ না করার প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তথ্য গোপন রাখার প্রাতিষ্ঠানিক কারণ থাকা স্বাভাবিক। কারণ পরীক্ষার ফলাফল গোপন রাখা এবং সেই ফলাফল নিয়ে কাউকে কথা বলতে নিষেধ করা—দুটিই তদন্তের স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সরাসরি জানান যে, পরীক্ষায় স্পার্ম (শুক্রাণু) মিলেনি এবং মূলত শ্বাসরোধ করেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। তিনি ঘটনাটিকে ‘স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তাই এখন প্রশ্ন উঠছে, ডোমের দাবি সত্য কি না, চিকিৎসকের কাছে এ বিষয়ে কী তথ্য রয়েছে এবং থাকলে তা তদন্তের কোন পর্যায়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পুলিশি বয়ান বনাম ফরেনসিক প্রমাণ
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে ফরেনসিক প্রমাণ। কে, কাকে এবং কী কারণে হত্যা করেছে-এ প্রশ্নের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে কী ধরনের আলামত পাওয়া গেছে, নিহতদের শরীরে আঘাতের ধরন কী, হত্যার সম্ভাব্য অস্ত্র কী ছিল, কার ডিএনএ বা আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে এবং ঘটনাটি ঘটার সময় কার অবস্থান কোথায় ছিল – এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
বিশেষ করে ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষার কথিত ফলাফল সত্য হলে তার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট কী বলছে? – তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে কি না এবং সেটির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
হত্যার পর খাওয়া-গোসলের ঘটনাও প্রশ্নের
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর দুই তরুণ শসা ও খেজুর খান এবং বাথরুমে গিয়ে গোসল করেন।
এখানেও প্রশ্ন উঠেছে, চারজন মানুষকে হত্যার পর তাঁদের আচরণ এতটা স্বাভাবিক ছিল কীভাবে?
তবে অপরাধতত্ত্বের দৃষ্টিতে হত্যার পর প্রত্যেক অপরাধীর আচরণ একই রকম হবে – এমন কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। কেউ আতঙ্কিত হতে পারেন, কেউ পালিয়ে যেতে পারেন আবার কেউ অস্বাভাবিকভাবে স্থিরও থাকতে পারেন। তাই খাওয়া বা গোসল করার মতো আচরণ দিয়ে অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
তবে পুলিশের বর্ণিত ঘটনাক্রমের সঙ্গে এই আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তদন্তে যাচাই করা যেতে পারে।
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল কে?
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং বাড়ির ভেতরে কোনো সাড়া-শব্দ না থাকার বিষয়টি।
যদি হত্যাকাণ্ডের আগে বা সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকে তাহলে কে সেটি করেছিল, কেন করেছিল এবং ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? – এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
একইভাবে ঘটনাস্থলে কত সময় ধরে হত্যাকাণ্ড চলেছে, নিহতরা প্রতিরোধ করেছিলেন কি না, প্রত্যেকের মৃত্যুর সময়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল কি না এবং অভিযুক্ত দুই তরুণের পক্ষে পুরো ঘটনাটি ঘটানো বাস্তবিকভাবে সম্ভব ছিল কি না – এসব বিষয়ও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত
এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনো একটি তত্ত্বকে দ্রুত চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করা।
যদি পুলিশের বর্তমান বয়ানই সত্য হয় তাহলে ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক প্রমাণ, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য এবং আসামিদের বক্তব্য – সবকিছু মিলিয়ে তার একটি সুস্পষ্ট ভিত্তি থাকার কথা। আবার তদন্তে যদি অন্য কোনো তথ্য উঠে আসে তাহলে সেটিও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামনে আসা প্রয়োজন।
কারণ চারজন মানুষ হত্যার মতো গুরুতর ঘটনায় শুধু ‘খুনি কারা’ প্রশ্নের উত্তরই যথেষ্ট নয়। জানতে হবে – হত্যাকাণ্ডটি কীভাবে ঘটেছে, প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ঘটনাস্থল ও ফরেনসিক প্রমাণ পুলিশের বর্তমান বয়ানকে কতটা সমর্থন করছে।
ন্যায়বিচারের জন্য স্বচ্ছতা জরুরি
রংপুরের এই ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বয়ান, হত্যার উদ্দেশ্য পরিবর্তনের বিষয়, নিহতদের স্বজনদের সংশয়, ডোমের বরাতে আসা অযাচাইকৃত ফরেনসিক দাবি এবং চিকিৎসকের অস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া – সবকিছু মিলিয়ে তদন্তে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এসব প্রশ্ন এককভাবে পুলিশের বক্তব্যকে ভুল প্রমাণ করে না। কিন্তু কোনো প্রশ্নকেই অপ্রয়োজনীয় বলেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে তাই দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো তত্ত্বকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেওয়া, আসামিদের বক্তব্যের সঙ্গে বস্তুগত প্রমাণের মিল যাচাই করা এবং নিহত পরিবারের যৌক্তিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া জরুরি।
কারণ চারটি প্রাণহানির এই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত মানুষের আস্থা ফিরবে পুলিশের বক্তব্যে নয়, প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে। কারণ, এই ঘটনার পর পুরো দেশের মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন – “তারা আদৌ নিরাপদে বাঁচতে পারবে কি না।”

