উচ্চ শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার আইনে একে কৃষি, প্রকৌশল ও চিকিৎসা শিক্ষা ছাড়া স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদানে সক্ষম কলেজ অধিভুক্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার দুইশ সাতান্নয়। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যার বিচারে এটি বিশ্বে শীর্ষস্থানে থাকলেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কানাডাভিত্তিক একটি গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যায় শীর্ষে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ সংখ্যা ও বৈশ্বিক র্যাংকিং বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, বিশেষত ভারত ও পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, তবে বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় তা এখনো অনেক কম। পাকিস্তানের একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা এক হাজারের কিছু বেশি, আর ভারতের দুটি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংখ্যা যথাক্রমে দেড়শ ও ৮৬টি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একাডেমিক গ্রহণযোগ্যতা, গবেষণা নেটওয়ার্ক ও নিয়োগকর্তাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক কোনো র্যাংকিংয়েই এখন পর্যন্ত জায়গা করে নিতে পারেনি বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, অথচ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনামূলক ছোট আকারের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব র্যাংকিংয়ে নির্দিষ্ট অবস্থানে রয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটির মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে একাডেমিক ক্যালেন্ডার জটিলতা, উচ্চ শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং দুর্বল মূল্যায়ন পদ্ধতিকে। বিশেষ করে পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে গবেষণায়—প্রশ্নপত্র মূলত আগের বছরগুলোর ধাঁচ অনুসরণ করে তৈরি হওয়ায় তা শিক্ষার্থীর প্রকৃত বিশ্লেষণী দক্ষতা যাচাই করতে পারে না, যার ফলে বাজারে পাওয়া সহায়ক বই দেখেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে পরিচালনা পর্ষদ ও স্টাডিজ বোর্ডের বিধান থাকলেও এসব সংগঠন দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিল, যদিও বর্তমান প্রশাসন এই পরিস্থিতি বদলাতে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন অধ্যাপক মন্তব্য করেন, দেশের উচ্চ শিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরে গভীর সংকটে ভুগছে, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ যেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা, সেখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমশ কেবল পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। পর্যাপ্ত তদারকি ও মানসম্মত শিক্ষক ছাড়াই হাজার হাজার কলেজকে সনদ দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় মান নিশ্চিত না করেই বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, এর অর্থনৈতিক পরিণতি মারাত্মক—তৈরি হচ্ছে লাখো বেকার গ্র্যাজুয়েট, যাদের ডিগ্রি থাকলেও বাস্তব দক্ষতার অভাব রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নতুন ডিগ্রি প্রদানকারী কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাৎক্ষণিক বিরতি এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যাচাই করে একীভূতকরণের পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী সামগ্রিকভাবে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার তেরো শতাংশের কিছু বেশি হলেও একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে এই হার প্রায় আটাশ শতাংশ। বাকিদের একটি বড় অংশ কর্মরত আছেন স্বল্প আয়ের চাকরিতে, আর নারী ও গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলক আরও বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক এক সদস্য বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে কখনো যথাযথ একাডেমিক মূল্যায়ন হয়নি। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা শিক্ষক না থাকা সত্ত্বেও অনেক কলেজে অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে মূলত রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে, যা শিক্ষার গুণগত বিস্তারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বর্তমানে দেশের সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রায় বাহাত্তর শতাংশই পড়াশোনা করছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য বলছে, প্রতিবছর এখানে লাখ লাখ আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে এবং এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
এ বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর বলেন, এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান নিবিড়ভাবে তদারকি করা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং, তবে এই সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে এবং শিক্ষার মান ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তিনি জানান, দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ স্থাপন, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মতো একাধিক উদ্যোগ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে, যার সুফল আগামী দুই থেকে চার বছরের মধ্যে দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন একজন সাবেক প্রো-উপাচার্য, যিনি বর্তমানে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত, মন্তব্য করেন, প্রতিষ্ঠানটিকে যেভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি এবং এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সরকার উভয়েরই ব্যর্থতা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, শিক্ষার মান বাড়াতে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা—কারণ মূল সমস্যা পাঠ্যক্রমে নয়, বরং তা যথাযথভাবে পড়ানোর ঘাটতিতে।

