ঢালিউডের চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেফতার খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পুলিশ পরিদর্শক মজিবুর রহমান ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছেন। আগামী বৃহস্পতিবার এ আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
সিআইডির তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রহস্যের আবরণে থাকা সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে তদন্ত করছে সংস্থাটি। গ্রেফতার ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে মামলার অন্য আসামিদের ভূমিকা, হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ এবং ঘটনার সময়কার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারের বিষয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক মজিবুর রহমান বলেন, ‘আগামী বৃহস্পতিবার রিমান্ড আবেদনের শুনানি রয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে।’
সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের বিশেষ পুলিশ সুপার বেনজির আহমেদ বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হবে।
গত ৯ আগস্ট ভোরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ সালমান শাহ হত্যা মামলার চার নম্বর আসামি আশরাফুল হক ডনকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, ‘গ্রেফতার আসামি ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে। মামলার অন্য আসামিরা সবাই দেশেই আছে। তাদের কেন এখনো গ্রেফতার করা হচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। তদন্তের পর আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, এটি হত্যাকাণ্ড এবং হত্যা মামলা হিসেবে নিতে হবে। কী কারণে সালমানকে হত্যা করা হয়েছে, সেটিও তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। আগে ঘটনাটিকে মিথ্যা বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এখন আসামিদের গ্রেফতার করে তাদের শাস্তির আওতায় আনা এবং কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তা জানা দরকার।’
সালমান শাহকে কেন হত্যা করা হয়েছে—এ বিষয়ে নীলা চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, চলচ্চিত্রের প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সালমানের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এছাড়া সোহান, সুকুমার রঞ্জন ও আনন্দ ফিল্মসের সঙ্গেও তার বিরোধ ছিল। সালমান তাদের চলচ্চিত্রে কাজ না করে অন্য ছোট প্রযোজকদের সঙ্গে কাজ করায় চলচ্চিত্র অঙ্গনের একটি পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ হয়েছিল বলে তার দাবি। তার ভাষায়, ‘এটি ছিল ফিল্মি পলিটিক্স। এর সঙ্গে সালমানের স্ত্রীকেও জড়ানো হয়েছিল। সালমানের শ্বশুরবাড়ির পরিবারও এ ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি জড়িত।’
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার নিজ ফ্ল্যাটে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় সালমান শাহকে পাওয়া যায় বলে তার স্ত্রী সামিরা হক দাবি করেছিলেন। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত হয়। যদিও সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারের অভিযোগ ছিল, এটি আত্মহত্যা নয়; পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে ঘটনার পর রমনা থানা পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করে এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করে। সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন।
ঘটনার প্রায় এক বছর পর ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করার আবেদন করেন বাবা কমর উদ্দিন। এরপর পুলিশ, সিআইডি ও পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনাটি তদন্ত করে। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সালমান শাহর অপমৃত্যু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম ঢাকার সিএমএম আদালতে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পরের বছর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের তৎকালীন প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেছিলেন, পিবিআইয়ের তদন্তে সালমান শাহকে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পারিবারিক কলহ ও মানসিক যন্ত্রণায় তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তবে পিবিআইয়ের ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন করেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়।
হত্যা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন—ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের মালিক রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে আলোচিত এ মৃত্যুর ঘটনায় এবার নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ায় ডনের রিমান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার অন্য আসামিদের ভূমিকা ও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য কতটা উন্মোচিত হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

